loader image
শিরোনাম

এনআরবিসিতে চাকুরিচ্যুত স্বত্তেও কমার্স ব্যাংকে চাকরি; ট্রেজারির দায়িত্বে জড়ালেন বড় অনিয়মে

নিজস্ব প্রতিবেদক

ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার জবাবদিহি নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে। একটি ব্যাংকের তদন্তে চুরি, প্রতারণা, অসততা, দুর্নীতি, দায়িত্বে অবহেলা এবং ব্যাংকের নিয়ম ভঙ্গের মতো গুরুতর অভিযোগে চাকরিচ্যুত একজন কর্মকর্তাকে অন্য একটি ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনায় এ প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, মি. মো. দেলোয়ার হোসেনকে ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল দেওয়া একটি চিঠিতে এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসি চাকরি থেকে বরখাস্ত করার বিষয়টি জানায়। চিঠিতে বলা হয়েছে, ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে উত্তরা শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালার একাধিক ধারা গুরুতরভাবে লঙ্ঘন করেছেন।

এনআরবিসি ব্যাংকের চিঠিতে যে ধারাগুলোর উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে দায়িত্ব পালনে অবহেলা, ব্যাংকের স্বার্থের পরিপন্থী কাজ, শৃঙ্খলা ভঙ্গ বা অসদাচরণ, দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, ব্যাংকের ব্যবসা বা সম্পদের সঙ্গে সম্পর্কিত চুরি-প্রতারণা-অসততা এবং ব্যাংকের নিয়ম, স্থায়ী আদেশ বা নির্দেশনা ভঙ্গ।

চিঠিতে আরও বলা হয়, দেলোয়ার হোসেন ২০২২ সালের ৫ ডিসেম্বর পদত্যাগপত্র দিলেও তার বিরুদ্ধে উত্তরা শাখার ১০টি তৈরি পোশাক খাতের গ্রাহকের ঋণসংক্রান্ত অনিয়মের তদন্ত চলমান থাকায় ব্যাংক তাকে অব্যাহতি দেয়নি। বরং তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে বিতরণ করা অর্থ উদ্ধারের জন্য তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালের ২৮ মার্চ তিনি আবারও ব্যাংক থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার নোটিশ দেন। এরপর মানবসম্পদ বিভাগ তাকে এনআরবিসি ব্যাংকে যোগ দিয়ে ঋণ আদায়ের নির্দেশ দেয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

কিন্তু নথি অনুযায়ী, পরবর্তীতে তিনি এনআরবিসি ব্যাংক থেকে আনুষ্ঠানিক অব্যাহতি না নিয়েই বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে যোগ দেন। এ ঘটনাকে ব্যাংকের নিয়ম ও সাধারণ রীতিনীতির লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের চিঠিতে তাকে ২০২৩ সালের ২৮ মার্চ থেকে কার্যকর দেখিয়ে চাকরিচ্যুত করার কথা জানানো হয়।

এখানেই বড় প্রশ্ন—এমন অভিযোগ ও চাকরিচ্যুতির নথি থাকা একজন কর্মকর্তাকে পরবর্তী সময়ে অন্য ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই কতটা কার্যকর ছিল?

আপনার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেলোয়ার হোসেন পরবর্তীতে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যোগ দেন এবং বর্তমানে অর্থভান্ডার বা ট্রেজারি বিভাগের দায়িত্বেও ছিলেন। প্রকাশিত সংবাদেও তাকে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী সহসভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত হলেই বাংলাদেশের আইনে কোনো ব্যক্তির আর কখনো কোনো ব্যাংকে চাকরি করার সুযোগ নেই—এমন সর্বজনীন বিধান বলা ঠিক হবে না। কিন্তু ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ নীতিমালায় বিষয়টি অত্যন্ত কঠোর। সেখানে আর্থিক আত্মসাৎ, দুর্নীতি, প্রতারণা বা নৈতিক লঙ্ঘনের কারণে কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মী হিসেবে অপসারিত বা চাকরিচ্যুত ব্যক্তিকে এমডি/সিইও হওয়ার অযোগ্যতার মধ্যে রাখা হয়েছে। একই নীতিমালায় শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়ে তৃতীয় বিভাগ বা শ্রেণি না থাকার শর্তও রয়েছে। 

অর্থাৎ ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যক্তির অতীত চাকরির রেকর্ড, সততা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যবেক্ষণ ও শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাই করার স্পষ্ট কাঠামো রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনও এ ধরনের নিয়োগে গুরুত্বপূর্ণ। 

তাহলে প্রশ্ন হলো, নিয়োগের ক্ষেত্রে এই যাচাই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? একটি ব্যাংকের তদন্তে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে চাকরিচ্যুত হওয়ার পর একই ব্যক্তি যদি অন্য ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল দায়িত্বে পৌঁছে যান, তাহলে প্রথম ব্যাংকের তদন্ত ও দ্বিতীয় ব্যাংকের নিয়োগ যাচাই—দুই জায়গাতেই কি তথ্যের আদান-প্রদান ও যথাযথ যাচাই হয়েছিল?

আরও বড় প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি নিয়ে। ব্যাংক খাতে অনিয়ম বন্ধে শুধু অনিয়ম শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়; অভিযুক্ত বা দোষী সাব্যস্ত কর্মকর্তার পরবর্তী কর্মজীবনেও যাতে একই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বে যাওয়ার সুযোগ না থাকে, সে জন্য কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

ব্যাংকের অর্থভান্ডার বা ট্রেজারি বিভাগ অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি জায়গা। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সততা, পেশাগত রেকর্ড ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে তার অতীত কর্মকাণ্ডের তথ্য কতটা যাচাই করা হয়েছে—এ প্রশ্নের উত্তর এখন সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেই দিতে হবে।

ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার কথা যখন জোর দিয়ে বলা হচ্ছে, তখন এক ব্যাংকের তদন্তে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ ওঠা এবং পরবর্তীতে অন্য ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার মতো ঘটনা নিঃসন্দেহে নিয়ন্ত্রক কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তাই মূল প্রশ্ন একটাই—ব্যাংকের অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে শুধু নীতিমালা থাকবে, নাকি নিয়োগ থেকে শুরু করে কর্মকর্তাদের পুরো কর্মজীবনজুড়ে কার্যকর জবাবদিহিও নিশ্চিত করা হবে?

Please follow and like us:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top