নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমানোর পর দেশের ব্যাংকিং খাতে ভোক্তাঋণের সুদহারে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তফসিলি ব্যাংকগুলো তাদের বিভিন্ন ধরনের ভোক্তাঋণ, বিশেষ করে ব্যক্তিগত ঋণ, গাড়ি ঋণ এবং গৃহনির্মাণ ও ফ্ল্যাট ক্রয় ঋণে সুদহার কমিয়ে নতুন সার্কুলার জারি করছে। কোনো কোনো ব্যাংক আগের তুলনায় এক থেকে আড়াই শতাংশীয় পয়েন্ট পর্যন্ত সুদহার কমিয়েছে। পাশাপাশি গ্রাহক আকর্ষণে বিভিন্ন ধরনের অফারও দিচ্ছে ব্যাংকগুলো।
ব্যাংকাররা বলছেন, নীতি সুদহার কমানোর ফলে ব্যাংকগুলোর তহবিল সংগ্রহের ব্যয় ধীরে ধীরে কমছে। এর প্রভাব ঋণের সুদহারে পড়তে শুরু করেছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ সুদহারের কারণে ঋণ নেওয়া থেকে বিরত থাকা অনেক গ্রাহক এখন নতুন করে ভোক্তাঋণের প্রতি আগ্রহী হতে পারেন। এতে সামগ্রিকভাবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও গতি আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে গৃহনির্মাণ ও ফ্ল্যাট ক্রয় ঋণে সুদহার কমানোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বাজারে এমন কিছু ব্যাংক রয়েছে, যারা সাড়ে ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে হাউস বিল্ডিং লোন দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এতে আবাসন খাতে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কিছুটা কাটতে পারে বলে মনে করছেন ব্যাংকার ও আবাসন খাতের সংশ্লিষ্টরা। কম সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলে ফ্ল্যাট কেনা, বাড়ি নির্মাণ এবং সংশ্লিষ্ট নির্মাণ কার্যক্রমে চাহিদা বাড়তে পারে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সুদহার কমার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে গ্রাহকের মাসিক কিস্তিতে। একই পরিমাণ ঋণ নিলেও কম সুদের কারণে গ্রাহকের পরিশোধযোগ্য অর্থ কমবে। এতে নতুন গ্রাহক তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান ঋণগ্রহীতাদের ওপরও চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকি মূল্যায়নে সতর্ক থাকতে হবে।
আরেক ব্যাংকারের মতে, দীর্ঘদিন উচ্চ সুদহারের কারণে ভোক্তাঋণের বাজারে যে চাপ তৈরি হয়েছিল, সুদহার কমার ফলে তা কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে। তবে কেবল সুদহার কমিয়ে ঋণ বিতরণ বাড়ালেই হবে না; গ্রাহকের আয়, ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা এবং সামগ্রিক ক্রেডিট প্রোফাইল বিবেচনা করে ঋণ দিতে হবে।
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, ভোক্তাঋণ বাড়ার ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি কিছু নেতিবাচক ঝুঁকিও রয়েছে। আয় না বাড়িয়ে শুধু সহজ ঋণপ্রাপ্তির কারণে মানুষের ভোগব্যয় বেড়ে গেলে তা মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত ঋণ গ্রহণের ফলে ভবিষ্যতে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা কমে গেলে খেলাপি ঋণ বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে চাকরি বা আয় অনিশ্চিত এমন গ্রাহকদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি বেশি।
এ ছাড়া ব্যাংকগুলো যদি বাজার দখলের প্রতিযোগিতায় অতিরিক্ত আগ্রাসী হয়ে ঋণ বিতরণ করে, তাহলে ঋণের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। ফলে সুদহার কমানোর পাশাপাশি ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা যাচাই এবং যথাযথ ক্রেডিট ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
তবে সামগ্রিকভাবে সুদহার কমার বর্তমান প্রবণতাকে ব্যাংকিং খাত ও অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ভোক্তাঋণের সুদহার কমার সঙ্গে যদি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় বৃদ্ধির ধারাও শক্তিশালী হয়, তাহলে ঋণপ্রবাহের এই গতি অর্থনীতিতে বহুমুখী ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এখন ব্যাংকগুলোর জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হবে কম সুদে ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি ঋণের গুণগত মান ও আদায় সক্ষমতা ধরে রাখা।
