নিজস্ব প্রতিবেদক
সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন (চুপ্পু) ব্যক্তিগত অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন—তা নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশন আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠানের তফসিল ঘোষণা করার পর সেই আলোচনা আরও তীব্র হয়েছে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক জোট, বিরোধী দল, কূটনৈতিক মহল এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ চললেও সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার পর নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম।
রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে শুরু থেকেই বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং ড. আব্দুল মঈন খানের নাম আলোচনায় ছিল। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার কারণে বর্তমান ক্যাবিনেট সচিব নাসিমুল গনির নামও বিভিন্ন মহলে উচ্চারিত হয়। একই সঙ্গে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত প্রতিনিধি আইরিন খানের নামও সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় যুক্ত হয়।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, গত ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ঘটে যাওয়া একটি প্রতীকী ঘটনা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘিরে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ওই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে যে বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করেন, তা রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই এটিকে কেবল প্রোটোকল নয়, বরং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তার প্রতি বিশেষ আস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
এদিকে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী নির্ধারণের পূর্ণ দায়িত্ব দলের চেয়ারপার্সন তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করেছে। ফলে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও দলীয় সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, এমন পরিস্থিতিতে দলীয় পরিচয়ের বাইরেও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাসম্পন্ন একজন ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করা হতে পারে।
সেই বিবেচনায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি ক্ষুদ্রঋণ আন্দোলনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি অর্জন করেছেন। শান্তিতে নোবেল পুরস্কারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মাননা তাকে বৈশ্বিক পরিসরে একটি গ্রহণযোগ্য মুখে পরিণত করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী দেশ এবং বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণী মহলে তার সুদীর্ঘ সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংকটকালে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছিল। সেই সময়ে নির্বাচন, প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা দেশ-বিদেশে আলোচিত হয়। ফলে জাতীয় সংকট মোকাবিলায় তার অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রপতি পদে বিবেচনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে সামনে আসতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে ড. ইউনূসকে ঘিরে তুলনামূলক কম বিরোধিতা লক্ষ্য করা যায়। অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে তার অবস্থান অনেক রাজনৈতিক দলের কাছেই গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। রাষ্ট্রপতির মতো সাংবিধানিক ও নিরপেক্ষ পদে এমন একটি গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বকে দায়িত্ব দেওয়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বার্তা বহন করতে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সাংবিধানিক জটিলতা কিংবা জাতীয় সংকটের সময় রাষ্ট্রপতির বিচক্ষণতা ও গ্রহণযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সে দৃষ্টিকোণ থেকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত, অভিজ্ঞ এবং সর্বজনস্বীকৃত কোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বেছে নেওয়ার বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় থাকতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বা অন্য কোনো ব্যক্তির নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। সরকার কিংবা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা থাকলেও সবকিছুই এখনও জল্পনা-কল্পনার পর্যায়ে রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক মহলের দৃষ্টি এখন একটাই প্রশ্নে—বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শেষ পর্যন্ত কাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে? সেই উত্তর মিলবে মনোনয়নপত্র দাখিল ও নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই। তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে দ্বিমত খুব কমই দেখা যাচ্ছে।
