loader image
শিরোনাম

২০২৮-২৯ থেকে অর্থবছর এপ্রিল-মার্চ হিসেবে গণনার সিদ্ধান্ত

দীর্ঘদিনের জুলাই-জুন অর্থবছরের কাঠামো থেকে বেরিয়ে এপ্রিল-মার্চকে নতুন অর্থবছর হিসেবে চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চলতি অর্থবছর শেষ হওয়ার পর ২০২৭-২৮ অর্থবছর হবে নয় মাসের। অর্থাৎ ২০২৭ সালের জুলাই থেকে শুরু হয়ে ওই অর্থবছর শেষ হবে ২০২৮ সালের মার্চে। এরপর ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে এপ্রিল-মার্চ সময়সীমা অনুসরণ করে অর্থবছর গণনা করা হবে।

অর্থবছরের সময় পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় একটি বড় ধরনের সংস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এর সুফল পেতে হলে রূপান্তরকালীন জটিলতা দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। কারণ অর্থবছরের সময়সীমা পরিবর্তনের সঙ্গে শুধু সরকারি বাজেটের সময়সূচিই বদলাবে না, বরং রাজস্ব আদায়, সরকারি ব্যয়, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, কর ব্যবস্থাপনা, হিসাবরক্ষণ, আর্থিক প্রতিবেদন এবং বেসরকারি খাতের ব্যবসায়িক পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আনতে হবে।

বর্তমানে বাংলাদেশে জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত অর্থবছর গণনা করা হয়। এ সময়ের সঙ্গে বর্ষাকাল ও দেশের বিভিন্ন মৌসুমি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে অবকাঠামো ও নির্মাণ খাতে বর্ষার কারণে অর্থবছরের প্রথম দিকে অনেক প্রকল্পের কাজ কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয় না। ফলে অর্থবছরের শেষ দিকে এসে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও বরাদ্দ ব্যয়ের চাপ বেড়ে যায়। নতুন অর্থবছর এপ্রিল থেকে শুরু হলে অর্থবছরের প্রথম কয়েক মাস তুলনামূলক অনুকূল আবহাওয়ায় উন্নয়নকাজ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এর ফলে সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের গুণগত মান বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। বছরের শেষ দিকে বরাদ্দ খরচ করার তাগিদে তড়িঘড়ি করে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রবণতা কমানো গেলে সরকারি অর্থের অপচয় কমতে পারে। একই সঙ্গে প্রকল্পের কাজের মানও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। অর্থবছরের শুরুতেই প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যক্রম জোরদার করা গেলে বছরের শেষ দিকে ব্যয়ের চাপও তুলনামূলক কম থাকবে।

নতুন সময়সীমার আরেকটি সম্ভাব্য সুবিধা হলো রাজস্ব ও সরকারি ব্যয়ের পরিকল্পনার সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সময়সূচির আরও ভালো সমন্বয়। এপ্রিল থেকে অর্থবছর শুরু হলে বছরের শুরুতেই নতুন বাজেট কার্যকর হবে এবং সরকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমগুলোকে সামনে রেখে ব্যয় পরিকল্পনা সাজাতে পারবে। এতে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় সময়ের ব্যবহার আরও কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আঞ্চলিক অর্থনীতির সঙ্গেও এর একটি সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিবেশী ভারত এপ্রিল থেকে মার্চ পর্যন্ত অর্থবছর অনুসরণ করে। ফলে দুই দেশের অর্থনৈতিক তথ্য, বাজেট, রাজস্বনীতি ও বিভিন্ন আর্থিক সূচকের তুলনামূলক বিশ্লেষণে কিছুটা সুবিধা তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিধি বিবেচনায় এটি ভবিষ্যতে ব্যবসা ও বিনিয়োগ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে অর্থবছর পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে রূপান্তরকাল। ২০২৭-২৮ অর্থবছর নয় মাসের হওয়ায় ওই বছরের রাজস্ব আদায়, সরকারি ব্যয়, বাজেট ঘাটতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাব আগের ১২ মাসের অর্থবছরের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা কঠিন হবে। নয় মাসের আয়-ব্যয়কে ১২ মাসের হিসাবের সঙ্গে তুলনা করলে অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঠিক চিত্র পাওয়া নাও যেতে পারে। ফলে ওই সময়ের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে নতুন পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।

এ ছাড়া অর্থবছরের সময় পরিবর্তনের কারণে করদাতা, ব্যবসায়ী, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাব ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন, কর হিসাব, ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, বাজেট প্রণয়ন এবং বিভিন্ন আর্থিক সফটওয়্যারেও প্রয়োজনীয় সমন্বয় করতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব ব্যবস্থার পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও নতুন সময়সীমার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।

বিশেষ করে কর আদায়ের ক্ষেত্রে রূপান্তরকাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে কর ও আর্থিক বছরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যে নিয়ম ও সময়সূচি চালু রয়েছে, সেগুলো নতুন অর্থবছরের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন আনতে হবে। যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া দ্রুত পরিবর্তন করা হলে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে এসব চ্যালেঞ্জ মূলত পরিবর্তনকালীন। দীর্ঘমেয়াদে নতুন কাঠামো কার্যকর হলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় এর সুফল পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ব্যবস্থাপনা, সরকারি অর্থ ব্যয়ের গুণগত মান এবং বাজেট বাস্তবায়নের দক্ষতা বাড়াতে এটি সহায়ক হতে পারে।

অর্থবছর পরিবর্তনের সাফল্য অবশ্য নির্ভর করবে এর বাস্তবায়ন কতটা পরিকল্পিত ও সমন্বিতভাবে করা হচ্ছে তার ওপর। আইন ও বিধি সংশোধনের পাশাপাশি সরকারি হিসাবব্যবস্থা, কর প্রশাসন, বাজেট প্রণয়ন, উন্নয়ন প্রকল্প এবং বেসরকারি খাতকে প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। নয় মাসের অন্তর্বর্তী অর্থবছরের আর্থিক হিসাবও এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে আগের ও পরবর্তী বছরের সঙ্গে তুলনা করা সহজ হয়।

সব মিলিয়ে জুলাই-জুন থেকে এপ্রিল-মার্চে অর্থবছর পরিবর্তন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। সঠিক পরিকল্পনা ও দক্ষ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই পরিবর্তন সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো, উন্নয়ন প্রকল্পে গতি আনা এবং আর্থিক পরিকল্পনাকে আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে রূপান্তরপর্বের জটিলতা যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত সুফলের বদলে সাময়িক প্রশাসনিক ও হিসাবসংক্রান্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।:::

Please follow and like us:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top