সরকারি ছুটি, বন্ধ থাকবে অফিস-আদালত ও ব্যাংক
নিজস্ব প্রতিবেদক
আজ ৫ আগস্ট—জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের এক ঐতিহাসিক পরিণতির স্মারক হিসেবে দিনটি প্রতিবছর পালন করা হচ্ছে। ২০২৫ সালে সরকার ৫ আগস্টকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে সাধারণ ছুটি নির্ধারণ করে।
এ উপলক্ষে আজ সরকারি অফিস-আদালতসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও নিয়মিত কার্যক্রম থাকবে না। ২০২৬ সালের সরকারি ছুটির তালিকাতেও ৫ আগস্ট ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
২০২৪ সালের ১ জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে কর্মসূচির সূচনা, তা ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম বৃহৎ গণআন্দোলনে রূপ নেয়। প্রথমদিকে আন্দোলনের মূল দাবি ছিল সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আন্দোলন ঘিরে সংঘাত, প্রাণহানি ও ব্যাপক দমন-পীড়নের অভিযোগে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।
১৬ জুলাই আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বেদনাবিধুর দিন। ওই দিন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ নিহত হন। তার মৃত্যুর দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন আরও ব্যাপক জনসমর্থন পায়। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের প্রাথমিক বিশ্লেষণেও আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে এবং আন্দোলন চলাকালে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের অভিযোগের কথা উঠে এসেছে।
এরপর আন্দোলন আর কেবল কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে যুক্ত হতে থাকেন। জুলাইয়ের শেষভাগে আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে সরকারবিরোধী বৃহত্তর গণআন্দোলনে রূপ নেয় কর্মসূচি।
জুলাইয়ের দিনগুলো তাই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক বিশেষ অধ্যায় হয়ে আছে। ৩১ জুলাইয়ের পরের দিনগুলোকে আন্দোলনকারীদের অনেকে প্রতীকীভাবে ‘৩২ জুলাই’, ‘৩৩ জুলাই’, ‘৩৪ জুলাই’, ‘৩৫ জুলাই’ ও ‘৩৬ জুলাই’ হিসেবে অভিহিত করেন। ক্যালেন্ডারে জুলাই মাস ৩১ দিনেই শেষ হলেও আন্দোলনের স্মৃতি ও উত্তাল সময়কে প্রতীকীভাবে আরও কয়েক দিন এগিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে তারা সেই সময়ের তীব্রতা ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য তুলে ধরেন।
শেষ পর্যন্ত আসে ৫ আগস্ট। সেদিন ছাত্র-জনতার আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় এবং শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। এর মধ্য দিয়ে তার দীর্ঘ শাসনামলের অবসান ঘটে। পরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এ আন্দোলনে প্রাণহানি, আহত হওয়া এবং মানুষের দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির ঘটনাও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক তদন্তে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন। প্রতিবেদনে শিশু, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের হতাহত হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
হাজারো পরিবার এই আন্দোলনের সময় স্বজন হারিয়েছে। অনেকে গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিয়েছেন। কেউ কেউ স্থায়ীভাবে শারীরিক সক্ষমতা হারিয়েছেন। আহত ও নিহতদের পরিবারগুলোর কাছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান তাই কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার নাম নয়; এটি স্বজন হারানোর বেদনা, ত্যাগ ও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি অধ্যায়।
২০২৫ সালের সরকারি গেজেটে ৫ আগস্টকে প্রতিবছর ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে সাধারণ ছুটিসহ পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকারি নথিতে দিনটিকে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত দিবস হিসেবেও ঘোষণা করা হয়েছে।
এ বছরও দিনটি উপলক্ষে সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস পালন উপলক্ষে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় বিভিন্ন প্রস্তুতি ও সমন্বয় সভা করেছে।
এক বছর পেরিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হচ্ছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস। সময়ের ব্যবধানে ২০২৪ সালের সেই উত্তাল দিনগুলো ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে। তবে সেই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রাণহানি, আহত মানুষের কষ্ট, স্বজন হারানো পরিবারের বেদনা এবং রাষ্ট্র ও সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যাশাগুলো এখনো প্রাসঙ্গিক।
৫ আগস্ট তাই শুধু একটি ছুটির দিন নয়—২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন, মানুষের অংশগ্রহণ, ত্যাগ, প্রাণহানি এবং রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের এক স্মারক দিন। নতুন প্রজন্মের কাছে দিনটি সেই সময়ের ইতিহাস জানার, নিহত ও আহতদের স্মরণ করার এবং ভবিষ্যতের বাংলাদেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রত্যয়ের দিন হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
