ইব্রাহিম খলিল শাওন
ড. ইউনূস বিদায় নিয়েছেন পাঁচ মাস আগে। বিদায় নেওয়ার সময় তিনি দেশের রিজার্ভ রেখে গিয়েছিলেন ৩৩ বিলিয়ন ডলার। সঙ্গে দেশবাসীর জন্য ছয় মাসের মজুদকৃত খাদ্যও রেখে গিয়েছিলেন।
অথচ ক্ষমতা গ্রহণের সময় দেশের রিজার্ভ ছিল মাত্র ১৯ বিলিয়ন ডলার। দেশটা তখন নেতিয়ে পড়া দুর্বা ঘাসের মতো বিধ্বস্ত।
ইউনূস সরকার সেই বিধ্বস্ত দেশের রিজার্ভকে টেনে তুলতে চেয়েছিল। টানতে টানতে সেই রিজার্ভ নিয়ে এসেছিল ৩৩ বিলিয়নে। অর্থাৎ রিজার্ভ বেড়েছিল ১৪ বিলিয়ন ডলার—বাংলাদেশি মুদ্রায় যার অঙ্ক বিপুল।
সংখ্যাটা কত বিশাল, তাই না?
এই বিশাল অঙ্কের রিজার্ভ বাড়ানো হয়েছিল মাত্র দেড় বছরে। আই রিপিট—মাত্র দেড় বছরে!
এই রিজার্ভ আরও বাড়ানো সম্ভব ছিল। কিন্তু পারেনি, কারণ আগের সরকারের রেখে যাওয়া বিপুল ঋণের বোঝাও সামলাতে হয়েছে ইউনূস সরকারকে।
সেই ঋণের দায় মেটানোর পাশাপাশি জনগণের স্বস্তির জন্য দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভর্তুকি দিতে হয়েছে। সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষগুলো যেন অন্তত একটু ভালোভাবে বাঁচতে পারে—সেই চেষ্টা ছিল।
রোজার মধ্যে যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে না বাড়ে, সে জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। শুধু রোজাতেই নয়, গত দেড় বছর চাঁদাবাজি ও নানা সিন্ডিকেটের কারণে যাতে পণ্যের দাম বেড়ে না যায়, সেদিকেও নজর রাখার চেষ্টা ছিল।
বিদ্যুৎ, গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবায় মানুষ যেন স্বস্তি পায়, সেই চেষ্টাও ছিল। ইউনূস সরকার জনগণকে দুটি ঈদ উপহার দিয়েছিল—অন্তত অনেকের কাছে সেই সময়টা স্বস্তির বলে মনে হয়েছিল। মানুষ হাসিমুখে বাজার করতে চেয়েছিল, স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চেয়েছিল।
অনেকে তখন বলেছিল—স্যার, আরও পাঁচ বছর থাকেন।
বিএনপির একটি অংশ সেই কথাকেই ধরে নিয়েছিল, ইউনূস সরকার হয়তো নির্বাচন দেবে না। এরপর কথায় কথায় ইউনূসকে গালি, আন্দোলন, রাজনৈতিক চাপ—সবই চলেছে।
ইউনূস সরকারের মাত্র দেড় বছরে অসংখ্য আন্দোলন হয়েছে। এর সঙ্গে ভয়াবহ বন্যা, বিমান দুর্ঘটনাসহ নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটেছে।
তার ওপর ছিল নানা প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক বাধা। সেনাপ্রধানের সঙ্গে সরকারের টানাপোড়েনের অভিযোগ, পুলিশের নিরাপত্তা দিতে না পারা, রাজনৈতিক দলগুলোর চাপ, প্রশাসনের ভেতরের নানা জটিলতা—সব মিলিয়ে সরকারকে প্রতিনিয়ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
তারপরও ড. ইউনূস দেশটাকে গুছিয়ে দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। বিডিআর হত্যাকাণ্ডের মামলাও নতুন করে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও কিছু সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ ছিল আলোচনায়। ভারতের কাছ থেকে তুলা আমদানিতে নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক নিয়ে আলোচনা, জাপানে বিপুলসংখ্যক পণ্য শুল্কমুক্তভাবে রপ্তানির সুযোগ তৈরির প্রচেষ্টা—এসবের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করতে চেয়েছিলেন।
আর সবশেষে নির্বাচনও দিয়েছিলেন।
অথচ নির্বাচনের পর যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবে তার কতটা পূরণ হয়েছে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
মানুষের বাসায় গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই, পানি নেই। নিত্যপণ্যের দামও অনেকের নাগালের বাইরে। মানুষের অসন্তোষ বাড়ছে।
অভিযোগ উঠছে—সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও নানা অনিয়ম আবার প্রকাশ্যে ফিরে আসছে। বিদ্যুৎ বিলসহ বিভিন্ন সেবার ব্যয়ও সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
আগে বলা হতো, নির্বাচিত সরকার এলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু নির্বাচনের পরও যদি মানুষের জীবনযাত্রার মৌলিক সমস্যাগুলো থেকে যায়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—কোথায় সেই পরিবর্তন?
জনগণ সরকারের কাছে খুব বেশি কিছু চায়নি। তারা বাড়ি-গাড়ি চায়নি, অঢেল টাকা চায়নি। তারা শুধু খেয়ে-পরে একটু স্বস্তিতে বাঁচতে চেয়েছিল।
ড. ইউনূস চেয়েছিলেন সেনাবাহিনী, রাজনৈতিক দল, আমলা ও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে। একই সঙ্গে নিজের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ আনা এবং বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করতে।
কিন্তু তিনি যখনই বিদেশ সফরে গেছেন, দেশে তখন নানা রাজনৈতিক সংঘাত, আন্দোলন, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার খবর এসেছে। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও অনেক ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিতে পারেনি—এমন অভিযোগও ছিল।
এতসব অস্থিতিশীলতার ভিড়ে ইউনূস সরকার তার মনমতো কাজ করার সুযোগ কতটা পেয়েছিল? নিজের দক্ষতা ও সক্ষমতাগুলোই বা কতটা কাজে লাগাতে পেরেছিল?
তিনি চেয়েছিলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের মতো হয়ে যাওয়া বাংলাদেশকে কিছুটা গুছিয়ে দিতে। কিন্তু দিনশেষে একরাশ কষ্ট, বিতর্ক ও আফসোস নিয়েই তাকে ফিরে যেতে হয়েছে পুরনো ঠিকানায়।
তার বিরুদ্ধে হয়তো হাজারটা অভিযোগ আছে। সমালোচনা আছে। তার সরকারের ভুল-ত্রুটিও ছিল। সেসব নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার।
কিন্তু তার চলে যাওয়ার পর আমাদের একটি প্রশ্নও করা দরকার—
আমরা কি একজন ড. ইউনূসকে ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পেরেছিলাম?
নিজেদের রাজনৈতিক মারামারি, বিভাজন, অসহিষ্ণুতা ও অসভ্যতার কারণে একজন সম্ভাবনাময় মানুষকে আমরা কি তার কাজ করার মতো পরিবেশ দিতে পেরেছিলাম?
এখন হয়তো তাকে তেমন কিছু মনে হচ্ছে না। হয়তো ভবিষ্যতেও হবে না।
কিন্তু কোনো একদিন যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, গ্যাস-বিদ্যুতের বাড়তি দাম কিংবা অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার চাপে মানুষ তিলে তিলে কষ্ট পাবে, তখন হয়তো মনে পড়বে—
আমাদের একজন ড. ইউনূস ছিলেন।
হয়তো তখন মনে হবে, মানুষটি নিখুঁত ছিলেন না; কিন্তু তাকে আমরা আরও একটু সময়, আরও একটু স্থিরতা এবং আরও একটু কাজ করার সুযোগ দিতে পারতাম।
