loader image
শিরোনাম

ব্যাংকে নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নতুন নির্দেশনা বাংলাদেশ ব্যাংকের

নিজস্ব প্রতিবেদক

ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, স্থিতিশীলতা ও আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে ব্যাংকের প্রবেশ পর্যায়ের (এন্ট্রি) পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থী বাছাই এবং নিয়োগের পর শিক্ষাগত সনদ যাচাই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জারি করা এক সার্কুলারে দেশের সব তফসিলি ব্যাংককে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়ন ও হালনাগাদ এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ ও স্থায়ীকরণের বিষয়ে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।

সার্কুলারে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, স্থিতিশীলতা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও মেধাভিত্তিক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এ লক্ষ্যে নিয়োগ, স্থায়ীকরণ, প্রশিক্ষণ, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন, পদোন্নতি, নৈতিকতা ও শৃঙ্খলাসহ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতি ও পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

প্রবেশ পর্যায়ের নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি বাধ্যতামূলক

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রবেশ পর্যায়ের পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের বাধ্যবাধকতা। যেসব পদে নিয়োগের জন্য প্রার্থীর পূর্ব অভিজ্ঞতা প্রয়োজন নেই, সেসব পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও সবার জন্য সমান আবেদনের সুযোগ নিশ্চিত করতে ব্যাংকের নিজস্ব ওয়েবসাইট, চাকরির ওয়েবসাইট এবং কমপক্ষে দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে।

নির্দেশনায় ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণার্থী কর্মকর্তা, সিনিয়র কর্মকর্তা, প্রবেশনারি কর্মকর্তা বা সমপর্যায়ের পদকে এন্ট্রি পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। একইভাবে প্রশিক্ষণার্থী সহকারী কর্মকর্তা, জুনিয়র কর্মকর্তা, প্রশিক্ষণার্থী ক্যাশ কর্মকর্তা, জুনিয়র ক্যাশ কর্মকর্তা, ক্যাশ কর্মকর্তা বা সমপর্যায়ের পদও এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত হবে।

এর ফলে ব্যাংকের এন্ট্রি পর্যায়ের নিয়োগে সীমিত পরিসরে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বা নির্দিষ্ট প্রার্থীদের সুযোগ দেওয়ার প্রবণতা কমবে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে আগাম তথ্য পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।

প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় মেধাবী প্রার্থী বাছাই

এন্ট্রি পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ওপর জোর দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সরাসরি অংশগ্রহণ বা অনলাইন মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় নৈর্ব্যক্তিক ও লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি মৌখিক পরীক্ষা আয়োজনের কথা বলা হয়েছে। এ ধরনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে সবচেয়ে যোগ্য ও মেধাবী প্রার্থীকে ব্যাংকে নিয়োগ দিতে হবে।

এ ছাড়া এন্ট্রি পদ ছাড়া অন্যান্য উচ্চতর পদে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। এসব পদে অন্তত মৌখিক পরীক্ষা আয়োজনের নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

নিয়োগের পর শিক্ষাগত সনদ যাচাই

নতুন নির্দেশনায় শুধু নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নয়, নিয়োগের পর প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাইয়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যোগদানের এক বছরের মধ্যে তার সর্বশেষ অর্জিত শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ যাচাই সম্পন্ন করতে হবে।

এ ছাড়া সার্কুলার জারির আগে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদও ৩১ মার্চ ২০২৭-এর মধ্যে যাচাই করতে হবে।

উচ্চতর পদে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে আগের প্রতিষ্ঠান থেকে প্রার্থীর শিক্ষাগত সনদ যাচাই করা হয়েছে—এমন প্রত্যয়ন থাকলেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবোর্ড, প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় বা ইনস্টিটিউট থেকে আলাদাভাবে সনদ যাচাইয়ের প্রয়োজন হবে না। তবে ব্যাংককে এ বিষয়ে যথাযথ প্রত্যয়ন গ্রহণ করতে হবে।

জাল সনদে কঠোর ব্যবস্থা:

কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ পরবর্তী সময়ে জাল প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি এ-সংক্রান্ত তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের করপোরেট মেমোরি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যাংকের চাকরিতে ভুয়া শিক্ষাগত সনদ ব্যবহারের সুযোগ কমানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিষয়ে তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হবে।

মানবসম্পদ নীতিমালা অনুমোদনের সময়সীমা:

বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু নিয়োগের ক্ষেত্রে নয়, ব্যাংকের সামগ্রিক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন বা হালনাগাদ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালায় স্থায়ী ও অস্থায়ী নিয়োগ, শিক্ষানবিশকাল ও স্থায়ীকরণ, প্রশিক্ষণ, বেতন-ভাতা, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন, জ্যেষ্ঠতা, পদোন্নতি, পদায়ন ও বদলি, শীর্ষ নির্বাহীদের উত্তরাধিকার পরিকল্পনা, চাকরির অবসান, ছুটি, আচরণবিধি, শৃঙ্খলা, স্বার্থের সংঘাত, দাপ্তরিক গোপনীয়তা ও অভিযোগ নিষ্পত্তির মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে প্রণীত বা হালনাগাদ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক ৩১ মার্চ ২০২৭-এর মধ্যে অনুমোদন করাতে হবে।

ব্যাংকিং খাতে সুশাসনে প্রভাব:

ব্যাংকের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সরাসরি ব্যাংকের সামগ্রিক সুশাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত। নিয়োগে অনিয়ম, অযোগ্য ব্যক্তির নিয়োগ কিংবা শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে জালিয়াতি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় তাই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে শুরু করে পরীক্ষা, মৌখিক মূল্যায়ন, শিক্ষাগত সনদ যাচাই এবং জাল সনদের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ব্যবস্থা—পুরো প্রক্রিয়াটিকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা করা হয়েছে। এর ফলে ব্যাংকে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি বা অস্বচ্ছতার সুযোগ কমার পাশাপাশি মেধাবী ও যোগ্য প্রার্থীদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশেষ করে এন্ট্রি পর্যায়ের নিয়োগে একাধিক মাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা চাকরিপ্রত্যাশীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। অন্যদিকে নিয়োগের পর শিক্ষাগত সনদ যাচাইয়ের নির্দেশনা ব্যাংকের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা বাড়াবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এসব নির্দেশনা জারি করেছে এবং তা অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে সার্কুলারে উল্লেখ করা হয়েছে।

Please follow and like us:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top