বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকার আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের অবসান, দুই দশকের পথচলায় রেখে গেলেন বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা ও অগণিত স্মৃতি
নিজস্ব প্রতিবেদক
অবশেষে সত্যি হলো সেই আশঙ্কা। আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের জার্সিতে আর দেখা যাবে না লিওনেল মেসিকে। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে যে মানুষটি আর্জেন্টিনার ফুটবলের সমার্থক হয়ে উঠেছিলেন, সেই মেসি এবার জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। আবেগঘন এক বার্তায় তিনি জানান, আর্জেন্টিনার হয়ে তাঁর পথচলা এখানেই শেষ।
মেসির এই ঘোষণা শুধু একজন ফুটবলারের অবসর নয়, এটি আর্জেন্টিনার ফুটবলের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সমাপ্তি। ২০০৫ সালে জাতীয় দলের হয়ে অভিষেকের পর থেকে প্রায় দুই দশক ধরে তিনি ছিলেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভরসা, সবচেয়ে বড় তারকা এবং সবচেয়ে আলোচিত মুখ। জাতীয় দলের হয়ে ২০০-এর বেশি ম্যাচে ১২৫ গোল করে তিনি হয়ে আছেন আর্জেন্টিনার সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ফুটবলার।
মেসির বিদায়টা অবশ্য কোনো রূপকথার শেষ অধ্যায়ের মতো হয়নি। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে শিরোপা থেকে বঞ্চিত হয়েছে আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচের পর থেকেই মেসির ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা চলছিল। শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের সেই হতাশার কয়েক সপ্তাহ পর জাতীয় দলকে বিদায় জানালেন তিনি।
তবে তাঁর নিজের বক্তব্যে স্পষ্ট, সিদ্ধান্তটি হঠাৎ নেওয়া নয়। মেসি জানিয়েছেন, বিশ্বকাপ ফাইনালের দুই দিন পর, ২১ জুলাই তিনি বিদায়ের কথাগুলো লিখেছিলেন। পরে বাবার মৃত্যুর পর সিদ্ধান্তটি নিয়ে তিনি আরও নিশ্চিত হন।
বিদায়ী বার্তায় মেসি লিখেছেন, জাতীয় দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত তাঁকে গভীরভাবে কষ্ট দিয়েছে। কিন্তু তাঁর উপলব্ধি, এটাই সঠিক সময়। আর্জেন্টিনার জার্সির জন্য তিনি সবসময় নিজের সবটুকু দিয়েছেন। শুধু সাম্প্রতিক সাফল্যের সময় নয়, কঠিন সময়েও তিনি লড়ে গেছেন দেশের জন্য, দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য।
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুটা কিন্তু এতটা মসৃণ ছিল না। একের পর এক বড় ম্যাচের ব্যর্থতা, সমালোচনা এবং জাতীয় দলের হয়ে শিরোপা জিততে না পারার হতাশা তাঁকে বহুবার কঠিন সময়ের মুখোমুখি করেছে। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার, পরপর কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্যর্থতা এবং জাতীয় দল থেকে সাময়িক অবসরের সিদ্ধান্ত তাঁর ক্যারিয়ারের বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে আছে।
কিন্তু সেই মেসিই পরে লিখেছেন নিজের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায়। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয় দিয়ে আর্জেন্টিনার দীর্ঘ শিরোপা খরা কাটান তিনি। ২০২২ সালে ইউরোপের বিপক্ষে ফাইনালিসিমা জয়ের পর কাতার বিশ্বকাপে পূর্ণতা পায় তাঁর স্বপ্ন। ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকাপ হাতে তোলেন মেসি। ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতে আর্জেন্টিনার সাফল্যের ধারাকে আরও সমৃদ্ধ করেন।
বিশ্বকাপ জয়ের পর মেসির সঙ্গে আর্জেন্টিনার সম্পর্কও যেন নতুন অর্থ পেয়েছিল। যে মানুষটিকে একসময় জাতীয় দলের ব্যর্থতার জন্য কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হতো, তিনিই হয়ে ওঠেন দেশের সবচেয়ে প্রিয় ক্রীড়া প্রতীক। তাঁর নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা শুধু শিরোপাই জেতেনি, ফিরে পেয়েছে আত্মবিশ্বাস ও গৌরবের অনুভূতি।
বিদায়ী বার্তায় মেসি আরও জানিয়েছেন, এখন থেকে তিনি মাঠের বাইরে থেকে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করবেন। জাতীয় দলের সঙ্গে তাঁর খেলোয়াড় হিসেবে সম্পর্ক শেষ হলেও আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসা কখনো শেষ হবে না। ২০ বছরের ভালোবাসার জন্য সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেছেন, এখন থেকে তিনি তাদেরই একজন হয়ে বাইরে থেকে দলকে উৎসাহ দেবেন—সুখে-দুঃখে, আরও বেশি করে।
মেসির এই বিদায়ে শেষ হলো শুধু একটি ফুটবল ক্যারিয়ারের অধ্যায় নয়, শেষ হলো একটি প্রজন্মের আবেগেরও একটি বড় অংশ। আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাঁর বাঁ পায়ের জাদু, অধিনায়কের বাহুবন্ধনী, চোখে জল, বিশ্বকাপ হাতে উল্লাস এবং কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার গল্প এখন ইতিহাস।
আর সেই ইতিহাসের শেষ পাতায় মেসির নিজেরই লেখা কয়েকটি অনুভূতি হয়তো সবচেয়ে বেশি মনে থাকবে—তিনি আর্জেন্টিনার হয়ে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন, দেশের মানুষের জন্য লড়েছেন এবং তাদের গর্বিত করতে চেয়েছেন।
শেষ হলো মেসির জাতীয় দলের পথচলা। কিন্তু আর্জেন্টিনার ফুটবলে তাঁর গল্পের শেষ নেই।
