loader image
শিরোনাম

ডারউইনে ইতিহাসের নতুন সূর্যোদয়, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের অবিস্মরণীয় জয়

তানজিদের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি, হাসান মাহমুদের আগুনঝরা বোলিং আর মিরাজের পাঁচ উইকেটে চার দিনের মহাকাব্যিক লড়াইয়ের শেষ অধ্যায় লিখল টাইগাররা

নিজস্ব প্রতিবেদক

কখনো কখনো একটি জয় শুধু স্কোরবোর্ডের কয়েকটি সংখ্যা বদলে দেয় না, বদলে দেয় একটি দলের আত্মপরিচয়। ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে বাংলাদেশের ৯ উইকেটের জয় তেমনই এক মুহূর্ত। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়—যে স্বপ্ন এতদিন ছিল দূরের, সেটিই এবার বাস্তব হয়ে দাঁড়াল। চার দিনের লড়াই শেষে স্কোরবোর্ড বলছে, অস্ট্রেলিয়া ১৯৮ ও ২৮৪; বাংলাদেশ ৪২৬ ও ৫৭/১। কিন্তু এই সংখ্যাগুলোর আড়ালে লেখা রয়েছে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের এক অসাধারণ গল্প।

গল্পটির প্রথম অধ্যায় শুরু হয়েছিল হাসান মাহমুদের হাত ধরে। প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংকে একেবারে ছিন্নভিন্ন করে ৫৫ রানে ৬ উইকেট নেন বাংলাদেশের এই পেসার। তাঁর আগুনঝরা বোলিংয়েই স্বাগতিকদের ইনিংস থামে মাত্র ১৯৮ রানে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে শুরুতেই এমন ধাক্কা দেওয়া ছিল বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি।

এরপর মঞ্চে আসেন তানজিদ হাসান তামিম। মাত্র দ্বিতীয় টেস্টেই ১৯৭ বলে ১০১ রানের অসাধারণ ইনিংস খেলে তিনি হয়ে যান অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সেঞ্চুরি করা প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার। তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল ধৈর্য, দৃঢ়তা এবং পরিস্থিতি বুঝে আক্রমণ করার অসাধারণ ক্ষমতা। মুমিনুল হকের ৪৯ ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ রান ইনিংসকে মজবুত ভিত দেয়। পরে মুশফিকুর রহিমের ৩৬ এবং মেহেদী হাসান মিরাজের ৬৫ রানের কার্যকর অবদান বাংলাদেশকে পৌঁছে দেয় ৪২৬ রানের বিশাল সংগ্রহে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২২৮ রানের প্রথম ইনিংস লিডই তখন বলে দিচ্ছিল—এই বাংলাদেশ আর আগের বাংলাদেশ নেই।

তবে টেস্ট ম্যাচ কখনো এক ইনিংসে জেতা যায় না। অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যামেরন গ্রিনের ১০৪ রানের লড়াকু সেঞ্চুরি কিছুটা হলেও স্বাগতিকদের ম্যাচে ফেরার আশা জাগিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের বোলাররা শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিরোধও ভেঙে দেন। আর এখানেই মিরাজের গল্পটি আলাদা করে লিখতে হয়।

দ্বিতীয় ইনিংসে মেহেদী হাসান মিরাজ যেন বল হাতে শিল্পীর মতো ছবি এঁকেছেন। পাঁচ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার লেজ গুটিয়ে দেন তিনি। নাথান লায়নের গুরুত্বপূর্ণ উইকেটটিও আসে তাঁর হাত ধরে। তাঁর সঙ্গে হাসান মাহমুদের গুরুত্বপূর্ণ ব্রেকথ্রু এবং তাইজুল ইসলামের নিয়ন্ত্রিত স্পিন অস্ট্রেলিয়াকে ২৮৪ রানে আটকে দেয়। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান।

শেষ অধ্যায়টিও ছিল বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে। তানজিদ দ্রুত ফিরে গেলেও শাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক কোনো বিপদ হতে দেননি। ৫৭ রানের ছোট লক্ষ্য পেরিয়ে বাংলাদেশ নিশ্চিত করে ৯ উইকেটের ঐতিহাসিক জয়।

এই জয় কোনো একক নায়কের নয়। হাসান মাহমুদের নতুন বল, তানজিদের ব্যাট, শান্ত-মুমিনুল-মুশফিকের দৃঢ়তা, মিরাজের অলরাউন্ড নৈপুণ্য, তাইজুলের নিয়ন্ত্রিত স্পিন, শাদমানের শেষ মুহূর্তের দায়িত্বশীল ব্যাটিং—সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে এই ইতিহাস।

ডারউইনের সবুজ মাঠে তাই শুধু অস্ট্রেলিয়ার পতন হয়নি; সেখানে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের আত্মবিশ্বাসেরও জন্ম হয়েছে নতুন করে। সাদা পোশাকে টাইগাররা এবার শুধু লড়াই করতে যায়নি, ইতিহাস লিখতে গিয়েছিল। আর চার দিনের সেই মহাকাব্যের শেষ লাইনে লেখা ‘অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ, ৯ উইকেটে জয়ী।

Please follow and like us:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top