জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তির ঠিক আগের দিন দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যকার সংঘাত ও উত্তেজনা নতুন করে রাজনৈতিক অস্বস্তি তৈরি করেছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনভর দফায় দফায় সংঘর্ষ, জকসুর ভিপি ও জিএসকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনার পর ১৪৪ ধারা জারি এবং রাজধানীর সরকারি আলিয়া মাদ্রাসায় সংঘর্ষে শিক্ষার্থীদের আহত হওয়ার ঘটনা—সব মিলিয়ে ৫ আগস্টের প্রাক্কালে রাজনীতির মাঠে তৈরি হয়েছে নতুন এক প্রশ্ন: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় যে রাজনৈতিক ঐক্য স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে শক্তি দিয়েছিল, তা কি এখন ক্ষমতা ও প্রভাবের দ্বন্দ্বে ভেঙে পড়ছে?
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ছাত্রশক্তি নিজেদের অবস্থান থেকে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু আন্দোলনের লক্ষ্য যখন ছিল একটি সরকারের পতন, তখন ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শ ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রভাবনার পার্থক্যগুলো অনেকটাই আড়ালে ছিল। রাজনৈতিক পালাবদলের পর সেই ভিন্নতা সামনে আসাটাই স্বাভাবিক। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা কি গণতান্ত্রিক রাজনীতির সীমারেখায় থাকবে, নাকি তা সংঘাতের পথে যাবে?
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বলছে, দ্বিতীয় আশঙ্কাটিই ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের পর জকসুর ভিপি ও জিএসকে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর আগে জকসুর নেতৃত্ব নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক অবস্থানগত টানাপোড়েন প্রকাশ্যে এসেছিল। এপ্রিল মাসে জকসুর কয়েকজন নেতা অভিযোগ করেছিলেন, ছাত্রশিবির সংগঠনটির ব্যানারকে দলীয় কর্মসূচির জন্য ব্যবহার করছে। বিপরীতে জিএস আব্দুল আলিম আরিফ দাবি করেছিলেন, নির্বাচিত ছাত্রনেতাদের ওপর হামলার প্রতিবাদ করাকে যদি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বলা হয়, তাহলে হামলাকে সমর্থন করাও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড।
অর্থাৎ বিরোধটি শুধু দুই ছাত্রসংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্বাচিত ছাত্র নেতৃত্বের বৈধতা, ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক প্রভাব এবং ভবিষ্যৎ ছাত্ররাজনীতির নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন।
এমন পরিস্থিতিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের আগের একটি নির্দেশও নতুন করে আলোচনায় আসছে। এপ্রিল মাসে ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও শিবিরের উত্তেজনার পর তিনি ছাত্রদল নেতাদের প্রতিপক্ষ ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে সংঘাতে না জড়াতে এবং উসকানিতে পা না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকেও সংগঠনের নেতাকর্মীদের সংযত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
এই বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য কম নয়। কারণ বিএনপি এখন রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তার সহযোগী ছাত্রসংগঠনের ক্যাম্পাস আচরণ সরাসরি সরকারের ভাবমূর্তির সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে। অতীতের ছাত্রলীগকেন্দ্রিক আধিপত্য ও সহিংসতার যে সমালোচনা রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম প্রেরণা ছিল, ছাত্রদলের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ তৈরি হলে তা বিএনপির জন্যও রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ছাত্রদল-শিবির সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বলেছিলেন, কার রক্ত ঝরল সেটি না দেখে তিনি প্রতিটি আহত তরুণকে নিজের সন্তানের মতো মনে করেন এবং কোনো ধরনের রক্তপাত চান না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রক্তপাতের জায়গা নয়, মানুষ তৈরির স্থান হিসেবে উল্লেখ করে তিনি এমন ঘটনার নিন্দা জানান।
তার বক্তব্যের মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে—জুলাই-পরবর্তী রাজনীতিতে ছাত্রসংগঠনগুলোর সংঘাত কেবল দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; এটি জনমনে নতুন করে রাজনৈতিক সহিংসতার ভয় তৈরি করতে পারে।
সরকারের অবস্থানও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এর আগে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষের ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো দলকে একতরফাভাবে দায়ী করা উচিত নয়। তিনি অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণের আহ্বান জানান।
৫ আগস্টের আগের দিনের ঘটনাগুলো তাই জাতীয় রাজনীতির জন্য এক ধরনের সতর্ক সংকেত। কারণ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল বিভিন্ন মত ও পথের মানুষের সম্মিলিত অবস্থান। সেই ঐক্য যদি আন্দোলনের লক্ষ্য অর্জনের পরপরই ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়, তাহলে অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার প্রশ্নের মুখে পড়বে।
এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—ছাত্ররাজনীতি বরাবরই জাতীয় রাজনীতির পরীক্ষাগার হিসেবে কাজ করে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের দেয়ালে যে স্লোগান ওঠে, যে নেতৃত্বের জন্য প্রতিযোগিতা হয় কিংবা যে সংঘাত তৈরি হয়, অনেক সময় তারই প্রতিফলন পরবর্তীতে জাতীয় রাজনীতিতে দেখা যায়। চলতি বছরের এপ্রিলেও চট্টগ্রাম, ঢাকা ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল-শিবিরের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার নজির দেখা গেছে।
ফলে ৫ আগস্টের প্রাক্কালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ হিসেবে দেখলে পুরো রাজনৈতিক বাস্তবতাটি ধরা পড়বে না। এর ভেতরে রয়েছে জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের নতুন ক্ষমতার সমীকরণ, ছাত্ররাজনীতিতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ জাতীয় রাজনীতিতে কে কতটা প্রভাব বিস্তার করবে—তার হিসাব।
সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন রাজনৈতিক নেতৃত্বের। বিএনপি, জামায়াত ও জুলাই আন্দোলনের অন্যান্য অংশীজনরা যদি নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে সংঘাতে না নিয়ে গিয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ রাখতে পারে, তাহলে জুলাইয়ের ঐক্যের ইতিবাচক উত্তরাধিকার রক্ষা করা সম্ভব হবে। আর যদি ক্যাম্পাসের সংঘর্ষ জাতীয় রাজনীতির মেরুকরণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর যে নতুন রাজনৈতিক বাংলাদেশের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেটিই অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
৫ আগস্ট তাই শুধু স্মরণ করার দিন নয়; এটি রাজনৈতিক আত্মসমালোচনারও দিন। প্রশ্ন একটাই—যে রাজনীতি পুরোনো দমন ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে মানুষকে রাজপথে নামিয়েছিল, সেই রাজনীতি কি শেষ পর্যন্ত পুরোনো সংঘাতের সংস্কৃতিতেই ফিরে যাবে?
