loader image
শিরোনাম

আগস্টে রেমিট্যান্স এলো ২৯৭ কোটি ডলার

ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় আসার প্রবণতা বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্বস্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক:

প্রবাসী আয়ের প্রবাহে শক্তিশালী গতি নিয়ে শেষ হয়েছে ২০২৬ সালের আগস্ট মাস। সদ্য সমাপ্ত মাসে দেশে ২৯৬ কোটি ৬৩ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে, যা এক মাসের ব্যবধানে যেমন বেড়েছে, তেমনি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় আসার প্রবণতা বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্বস্তির পাশাপাশি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে মোট ২৯৬ কোটি ৬৩ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। জুলাইয়ে এর পরিমাণ ছিল ২৮৫ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক মাসে রেমিট্যান্স বেড়েছে ১০ কোটি ৭৯ লাখ ডলার বা প্রায় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।

তবে আগস্টের রেমিট্যান্স প্রবাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বছরের একই সময়ের তুলনা। ২০২৫ সালের আগস্টে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল প্রায় ২৪২ কোটি ডলার। সে হিসাবে চলতি বছরের আগস্টে রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৫৫ কোটি ডলার বা ২২ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ মাসভিত্তিক সামান্য ওঠানামার বাইরে বছরভিত্তিক হিসাবেও প্রবাসী আয়ের প্রবাহে শক্তিশালী ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।

ব্যাংকিং খাতের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগস্টে মোট রেমিট্যান্সের সিংহভাগই এসেছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। এসব ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ২২৩ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে এসেছে ৪৩ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ২৯ কোটি ১৯ লাখ ডলার এবং বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে এসেছে ৬৭৪ লাখ ডলার।

ব্যাংকভিত্তিক হিসাবে আগস্টে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির মাধ্যমে। ব্যাংকটির মাধ্যমে এসেছে ৫৫ কোটি ৯ লাখ ডলার। এরপর রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি ২৫ কোটি ২৮ লাখ ডলার, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক পিএলসি ১৫ কোটি ৬৮ লাখ ডলার, ঢাকা ব্যাংক পিএলসি ১৪ কোটি ৮৪ লাখ ডলার এবং সিটি ব্যাংক পিএলসি ১৩ কোটি ৫৩ লাখ ডলার।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি সর্বোচ্চ ১৬ কোটি ২১ লাখ ডলার রেমিট্যান্স সংগ্রহ করেছে। সোনালী ব্যাংক পিএলসির মাধ্যমে এসেছে ১৩ কোটি ৯৯ লাখ ডলার এবং জনতা ব্যাংক পিএলসির মাধ্যমে ৭ কোটি ৯৩ লাখ ডলার।

আগস্টে এসবিএসি ব্যাংক পিএলসির মাধ্যমেও রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মাসটিতে এসবিএসি ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে এসেছে ৭ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। জুলাইয়ে ব্যাংকটির মাধ্যমে এসেছিল ৩ কোটি ১৮ লাখ ডলার। ফলে এক মাসে এসবিএসি ব্যাংকের রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ৪ কোটি ১৭ লাখ ডলার বা প্রায় ১৩১ শতাংশ।

আগস্টের সাপ্তাহিক হিসাবেও প্রবাসী আয়ের প্রবাহে বেশ কিছুটা পরিবর্তন দেখা গেছে। মাসের প্রথম ৮ দিনে দেশে আসে ৯৩ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। ৯ থেকে ১৫ আগস্ট আসে ৭১ কোটি ৬৩ লাখ ডলার। ১৬ থেকে ২২ আগস্ট আসে ৪৯ কোটি ৩৬ লাখ ডলার এবং ২৩ থেকে ২৯ আগস্ট আসে ৫২ কোটি ১২ লাখ ডলার। মাসের শেষ দুই দিনে এসেছে আরও ২৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার। ফলে মাসের শেষ দিকে রেমিট্যান্স প্রবাহ আবারও জোরালো হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, আগস্টে রেমিট্যান্স বাড়ার পেছনে কয়েকটি যৌক্তিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, প্রবাসীদের বড় একটি অংশ ঈদ, পারিবারিক ব্যয়, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটাতে দেশে অর্থ পাঠান। দ্বিতীয়ত, বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে সুবিধা ও প্রণোদনা থাকায় প্রবাসীদের একটি অংশ এখন আগের তুলনায় আনুষ্ঠানিক চ্যানেল ব্যবহার করছেন। একই সঙ্গে ব্যাংক ও এক্সচেঞ্জ হাউসগুলোর মাধ্যমে দ্রুত অর্থ পৌঁছে যাওয়ার সুবিধাও বৈধ পথে রেমিট্যান্স বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।

বিশ্লেষকরা আরও মনে করেন, ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময়মূল্যে তুলনামূলক আকর্ষণীয় হার পাওয়াও প্রবাসীদের বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বাড়াতে পারে। এর সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে সাম্প্রতিক স্থিতিশীলতা এবং ব্যাংকগুলোর রেমিট্যান্স সংগ্রহে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির প্রভাবও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো প্রবাসী আয় সংগ্রহের জন্য নিজস্ব রেমিট্যান্স পার্টনার ও ডিজিটাল সেবার পরিধি বাড়িয়েছে, ফলে বিদেশ থেকে অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া আগের তুলনায় সহজ হয়েছে।

তাদের মতে, হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না হলেও বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর ব্যবধান কমানো গেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক বিনিময় হার, দ্রুত অর্থ পরিশোধ, সহজ ডিজিটাল সেবা এবং প্রবাসীদের জন্য ব্যাংকিং সুবিধা সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

রেমিট্যান্সের এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের জন্যও ইতিবাচক। কারণ ব্যাংকিং চ্যানেলে বেশি ডলার প্রবেশ করলে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ে এবং আমদানি দায় পরিশোধে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা শক্তিশালী হয়। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে ডলারের ওপর চাপ কমলে বিনিময় হারেও স্থিতিশীলতা তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়লেই হবে না, এই অর্থ যেন দেশের উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত হয় সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রবাসী আয়ের একটি বড় অংশ যদি সঞ্চয়, বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা তৈরি এবং উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে প্রবাহিত করা যায়, তাহলে রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।

সব মিলিয়ে জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি এবং একই সঙ্গে আগের বছরের আগস্টের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি প্রবাসী আয় আসা অর্থনীতির জন্য স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে এই প্রবাহ ধরে রাখা গেলে চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব আরও দৃশ্যমান হতে পারে।

Please follow and like us:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top