নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত বিভিন্ন প্রণোদনা ও নীতি সহায়তা পেতে হলে গ্রাহকদের আগে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। কোনো আবেদনকারীর বিরুদ্ধে বা আবেদনকারীর দায়ের করা মামলা চলমান থাকলে সেই মামলা নিষ্পত্তি বা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত নতুন কোনো নীতি সহায়তার আবেদন বিবেচনা করা হবে না। এ বিষয়ে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়িয়ে বেসরকারি বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের প্রণোদনা ও নীতি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এর আওতায় রপ্তানিমুখী বন্ধ কলকারখানা চালু করা, কৃষি, ক্ষুদ্র, অতি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পসহ বিভিন্ন খাতের ঋণগ্রহীতাদের ব্যাংকের মাধ্যমে প্রণোদনা ও নীতি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংক লক্ষ্য করেছে, কিছু গ্রাহক একদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষিত প্রণোদনা বা নীতি সহায়তা গ্রহণ করছেন, অন্যদিকে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিট পিটিশনসহ বিভিন্ন ধরনের মামলা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ধরনের পরিস্থিতিকে ব্যাংকিং খাতে মামলা জটিলতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এ কারণে নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষিত কিংবা ভবিষ্যতে ঘোষিতব্য প্রণোদনা প্যাকেজসহ অন্য যেকোনো নীতি সহায়তা দেওয়ার আগে আবেদনকারীর বিরুদ্ধে বা আবেদনকারীর দায়ের করা মামলা রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।
কোনো আবেদনকারীর সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিট পিটিশনসহ অন্য কোনো মামলা অনিষ্পন্ন অবস্থায় থাকলে, সেই মামলা প্রত্যাহারের শর্তে আবেদনটি বিবেচনা করতে হবে। অর্থাৎ মামলা চলমান রেখে একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সহায়তা বা প্রণোদনা সুবিধা নেওয়ার সুযোগ থাকছে না।
শুধু মামলা প্রত্যাহারের মৌখিক ঘোষণা যথেষ্ট হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রত্যাহার করা মামলাগুলোর তালিকা সংশ্লিষ্ট আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি আবেদনকারীর কাছ থেকে একটি হলফনামা নিতে হবে। ওই হলফনামায় গ্রাহককে ঘোষণা দিতে হবে যে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে তার দায়ের করা আর কোনো মামলা অনিষ্পন্ন নেই।
এর ফলে নীতি সহায়তা দেওয়ার আগে ব্যাংকগুলোকে গ্রাহকের মামলা-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে নিতে হবে। একই সঙ্গে আবেদনকারীকে তার মামলা প্রত্যাহারের প্রমাণ এবং এ বিষয়ে হলফনামা জমা দিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের ফলে বিভিন্ন প্রণোদনা ও নীতি সহায়তা গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নতুন একটি শর্ত যুক্ত হলো। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান ব্যাংকঋণ পুনর্গঠন, পুনঃতফসিল, প্রণোদনা বা অন্য কোনো বিশেষ নীতি সহায়তা নেওয়ার জন্য আবেদন করবে, তাদের মামলা-সংক্রান্ত বিষয়টি আগে পরিষ্কার করতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ উদ্যোগের পেছনে ব্যাংকিং খাতে মামলা জট কমানোর পাশাপাশি নীতি সহায়তার কার্যকারিতা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। একই গ্রাহক যদি একদিকে সরকারের নীতি সহায়তা গ্রহণ করেন এবং অন্যদিকে সেই সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংকের বিরুদ্ধেই মামলা চালিয়ে যান, তাহলে ঋণ ব্যবস্থাপনা ও নীতি সহায়তা বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হতে পারে। নতুন নির্দেশনার মাধ্যমে এই দ্বৈত অবস্থান বন্ধ করতে চাইছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বিশেষ করে উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো, বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করা, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো উদ্দেশ্যে যেসব নীতি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো যাতে মামলা জটিলতায় আটকে না যায়, সেটিই নতুন নির্দেশনার অন্যতম লক্ষ্য।
বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এ নির্দেশনা জারি করেছে। সার্কুলারে বলা হয়েছে, নির্দেশনাটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
ফলে এখন থেকে নতুন কোনো প্রণোদনা প্যাকেজ বা নীতি সহায়তার জন্য আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট গ্রাহককে তার চলমান মামলার বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে হবে। আর মামলা প্রত্যাহারের পর তার তালিকা ও মামলা অনিষ্পন্ন না থাকার বিষয়ে হলফনামা জমা দেওয়ার পরই ব্যাংক আবেদনটি নীতি সহায়তার জন্য বিবেচনা করতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপ ব্যাংকিং খাতে ঋণসংক্রান্ত মামলা ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে নীতি সহায়তার সুবিধা গ্রহণ এবং একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বিরুদ্ধে মামলা চালিয়ে যাওয়ার যে দ্বৈত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, নতুন নির্দেশনার মাধ্যমে সেখানে একটি স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান নেওয়া হলো।
