নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ আগস্ট। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে দিনটি এখন আর কেবল একটি তারিখ নয়; এটি একদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত পরিণতির স্মারক, অন্যদিকে ক্ষমতার পালাবদল, রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো নিয়ে চলমান বিতর্কের অন্যতম প্রতীক। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেই আন্দোলনের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি। বরং সময় যত গড়াচ্ছে, জুলাইয়ের সেই শক্তিকে কে নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতার ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে—এ প্রশ্নই যেন নতুন করে সামনে আসছে।
এবারের ৫ আগস্ট তাই অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করছে। কারণ, একদিকে ক্ষমতায় বিএনপি সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে উঠে আসা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং জামায়াতে ইসলামী জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।
সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই—জুলাইয়ের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে? বিএনপির দাবি, তারা দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ক্ষমতায় এসেছে এবং জুলাই সনদের বাস্তবায়নেও তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে জুলাই সনদের প্রতিটি শর্ত বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছেন। কিন্তু এনসিপি ও জামায়াতের বক্তব্য হচ্ছে, কেবল নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনই জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষার পূর্ণ বাস্তবায়ন নয়; রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান, সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা ও ক্ষমতার কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন।
এই জায়গাতেই ৫ আগস্টের রাজনীতি নতুন মাত্রা পেয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে কর্মসূচি, সমাবেশ ও রাজনৈতিক তৎপরতা চলছে। ফলে দিবসটি সরকারি আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; এটি পরিণত হচ্ছে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের দিনেও। সরকারি কর্মসূচির পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর কর্মসূচি—দুটিই একই দিনে জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে।
এর মধ্যেই দিল্লি থেকে শেখ হাসিনার বক্তব্যের খবর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন উত্তাপ তৈরি করেছে। ৫ আগস্ট নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ার আয়োজনে একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন/সেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে শেখ হাসিনা অডিওর মাধ্যমে যুক্ত হয়ে দেশে ফেরার পরিকল্পনা এবং তাঁর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে বক্তব্য দিতে পারেন। অনুষ্ঠানে সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক মন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং সাবেক ক্রিকেটার ও সাবেক সংসদ সদস্য সাকিব আল হাসানসহ কয়েকজনের অংশগ্রহণের কথা রয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, শেখ হাসিনা এর আগে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডিসেম্বর নাগাদ দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। সেই বক্তব্যের পর তাঁর দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। তাঁর এই ঘোষণাকে ঘিরে এনসিপির পক্ষ থেকেও তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁর বিরুদ্ধে দেওয়া সাজা কার্যকর হওয়া উচিত।
অর্থাৎ, শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিতকে শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছে না বাংলাদেশের রাজনৈতিক পক্ষগুলো। এটি এখন বিচার, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, রাজনৈতিক পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রের আইনগত অবস্থানের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকা এবং দলটির একাধিক নেতার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতাসীনদের জন্য রাজনৈতিক ও আইনগতভাবে স্পর্শকাতর বিষয়।
এখানে ভারতের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনা দীর্ঘদিন ধরে ভারতে অবস্থান করছেন এবং বাংলাদেশ সরকার তাঁর প্রত্যাবর্তনের জন্য কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ার কথা বলেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, বিদ্যমান প্রত্যর্পণ ব্যবস্থার আওতায় তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে দিল্লি থেকে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়; এর সঙ্গে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের প্রশ্নও যুক্ত হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে সাকিব আল হাসানের উপস্থিতিও আলাদা তাৎপর্য বহন করছে। সাকিব বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলোর একজন হলেও গত কয়েক বছরে তাঁর পরিচয় কেবল ক্রিকেটার হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন এবং শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে এক সাক্ষাৎকারে সাকিব আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
তাই ৫ আগস্টের দিল্লির অনুষ্ঠানে সাকিবের অংশগ্রহণকে নিছক একজন ক্রীড়া ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি হিসেবে দেখার সুযোগ কম। এটি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বয়ানে তাঁর অবস্থানকে আরও দৃশ্যমান করতে পারে। বিশেষ করে শেখ হাসিনার বক্তব্যের একই মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি রাজনৈতিক বার্তার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে তাঁর উপস্থিতির প্রকৃত উদ্দেশ্য বা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে অনুমান না করে অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্য কী হয়, সেটিই হবে মূল বিষয়।
অন্যদিকে বিএনপির জন্য পরিস্থিতি এক ধরনের দ্বিমুখী চাপ তৈরি করছে। একদিকে সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হচ্ছে; অন্যদিকে জুলাইয়ের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের প্রশ্নে তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা সামলাতে হচ্ছে। সরকার যদি জুলাই সনদ ও সংস্কার প্রশ্নে ধীরগতির হয়, তাহলে এনসিপি ও জামায়াত সেই অসন্তোষকে রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার সুযোগ পাবে। আবার অতিরিক্ত রাজনৈতিক সংঘাত তৈরি হলে সরকারের স্থিতিশীলতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
এনসিপির জন্যও চ্যালেঞ্জ কম নয়। জুলাইয়ের আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া দল হিসেবে তাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সম্পদ হচ্ছে সেই আন্দোলনের নৈতিক ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার। কিন্তু সেই উত্তরাধিকারকে দীর্ঘমেয়াদি নির্বাচনী শক্তিতে পরিণত করতে হলে শুধু রাজপথের আন্দোলন যথেষ্ট নয়; সাংগঠনিক বিস্তার, সুস্পষ্ট অর্থনৈতিক কর্মসূচি এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক ভাষা প্রয়োজন। জামায়াতের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক সমন্বয় এই জায়গায় যেমন শক্তি বাড়াতে পারে, তেমনি নতুন প্রশ্নও তৈরি করতে পারে।
কারণ জুলাইয়ের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এর বহুমাত্রিকতা। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক মত, তরুণ প্রজন্ম এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। ফলে কোনো একটি রাজনৈতিক দল যদি এককভাবে জুলাইয়ের মালিকানা দাবি করতে চায়, তা কতটা গ্রহণযোগ্য হবে—এ প্রশ্নও সামনে থাকবে।
৫ আগস্টের আরেকটি বড় তাৎপর্য হলো, এটি এখন স্মৃতি বনাম ভবিষ্যৎ রাজনীতির সংঘাতের দিন। সরকারের কাছে দিনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে জুলাইয়ের অর্জনকে স্মরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক করার সুযোগ। এনসিপি ও জামায়াতের কাছে এটি সংস্কার ও রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর সুযোগ। আর আওয়ামী লীগের জন্য, বিশেষ করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন অংশের কাছে, এটি নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্য পুনরায় সামনে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ।
সব মিলিয়ে আগামীকালকের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনটি সমান্তরাল বার্তা তৈরি করতে পারে। প্রথমত, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কে ধারণ করবে। দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের দেশে ফেরার ঘোষণা বাস্তবে কোন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সূচনা করে। তৃতীয়ত, বিএনপি সরকার এবং রাজপথের নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর দ্বন্দ্ব কোন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়ায়।
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—জুলাইয়ের দুই বছর পর বাংলাদেশ কি আবারও ব্যক্তি ও দলকেন্দ্রিক সংঘাতের রাজনীতিতে ফিরে যাবে, নাকি জুলাইয়ের মূল আকাঙ্ক্ষা হিসেবে যে জবাবদিহি, গণতন্ত্র, প্রতিষ্ঠানগত সংস্কার ও রাজনৈতিক ভারসাম্যের কথা বলা হয়েছিল, সেদিকে এগোবে?
আগামীকালকের কর্মসূচি, দিল্লি থেকে শেখ হাসিনার বক্তব্য এবং রাজপথের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হয়তো সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেবে না। কিন্তু এগুলো আগামী কয়েক মাসের বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংকেত দিতে পারে। বিশেষ করে ডিসেম্বরের দিকে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে সামনে রেখে যদি রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র হয়, তাহলে ৫ আগস্টের স্মরণদিবস কেবল অতীতের একটি অধ্যায়ের স্মৃতি হয়ে থাকবে না; বরং এটি হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনাবিন্দু।
এ কারণেই এবারের ৫ আগস্টে উৎসবের আবহের পাশাপাশি রাজনীতিতে যে চাপা উত্তেজনা, অনিশ্চয়তা ও পাল্টাপাল্টি অবস্থান তৈরি হয়েছে, তার গুরুত্ব অনেক বেশি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর বাংলাদেশের রাজনীতি এখন মূলত একটি প্রশ্নের মুখোমুখি—জুলাইয়ের পরিবর্তন কি কেবল ক্ষমতার হাতবদল ছিল, নাকি রাষ্ট্র ও রাজনীতির চরিত্র বদলের সূচনা?
