loader image
শিরোনাম

ব্যাংকিং খাতে জাল সনদে চাকরি: প্রশ্ন উঠছে নিয়োগ ব্যবস্থা নিয়েও

নিজস্ব প্রতিবেদক

ব্যাংকের চাকরি বাংলাদেশের তরুণদের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই কাঙ্ক্ষিত পেশার একটি। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, কঠোর যাচাই-বাছাই এবং মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ—এটাই ছিল ব্যাংকিং পেশার প্রতি মানুষের আস্থার মূল ভিত্তি। কিন্তু সেই ব্যবস্থার আড়ালে যদি কেউ ভুয়া শিক্ষাগত সনদ দেখিয়ে চাকরিতে ঢুকে পড়েন, বছরের পর বছর বেতন-ভাতা নেন এবং একপর্যায়ে পদোন্নতিও পান, তাহলে প্রশ্ন শুধু ওই ব্যক্তির সততা নিয়েই ওঠে না; প্রশ্ন ওঠে পুরো নিয়োগ ও সনদ যাচাই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও।

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে এমন অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে ভুয়া শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার করে চাকরি নেওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। কয়েক বছর আগেই দেশের বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। অভিযোগ ছিল, জাল সনদ ব্যবহার করে অনেকে ব্যাংকে চাকরি করছেন এবং আগেও তদন্তের মাধ্যমে এমন ব্যক্তিদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল।

সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশকে ঘিরে বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে ব্যাংকটির ২১ জন নির্বাহীর শিক্ষাগত সনদ জাল হিসেবে শনাক্ত হওয়ার পর তাদের চাকরিচ্যুত করার খবর প্রকাশ্যে এসেছে। ঘটনাটি শুধু সংখ্যার বিচারে গুরুত্বপূর্ণ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্যাংকটির নিয়োগব্যবস্থা, সাবেক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়মের অভিযোগ।

ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে ২০১৭ সালের পরের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে। বিভিন্ন অনুসন্ধান ও সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময়ে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়। দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগ পাওয়া ৫ হাজার ৩৮৫ কর্মকর্তার জন্য বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং তাদের একটি বড় অংশ ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নিয়োগ পেয়েছিলেন। একই প্রতিবেদনে নিয়োগে পরীক্ষা না দেওয়া এবং জাল সনদ ব্যবহারের অভিযোগের কথাও উঠে আসে।

আরেকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণকালে ইসলামী ব্যাংকে প্রায় ১০ হাজার কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল এবং এসব নিয়োগের বড় অংশ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ফলে এখন যেসব সনদ জাল হিসেবে শনাক্ত হচ্ছে, সেগুলোকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি বোঝা কঠিন। বরং দেখতে হবে নিয়োগের সময় এসব সনদ কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল কি না এবং নিয়োগের পর নিয়মিতভাবে কর্মীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা পুনরায় যাচাইয়ের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল কি না।

জাল সনদ দিয়ে চাকরি নেওয়ার ঘটনা সাধারণ কোনো অনিয়ম নয়। একজন প্রার্থী যদি নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দিয়ে চাকরি পান, তাহলে তিনি একই পদে আবেদন করা প্রকৃত যোগ্য একজন প্রার্থীর সুযোগও কেড়ে নেন। তার ওপর ব্যাংকের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে এমন কর্মী নিয়োগ পেলে ঝুঁকির মাত্রা আরও বেড়ে যায়। কারণ ব্যাংকের কর্মকর্তা শুধু একজন কর্মচারী নন; তিনি গ্রাহকের অর্থ, ঋণ, নথিপত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, জাল সনদধারী কেউ যদি কয়েক বছর চাকরি করার পর শনাক্ত হন, তখন দায় শুধু তার ওপর চাপিয়ে প্রতিষ্ঠান পার পেতে পারে না। নিয়োগের সময় সনদ যাচাইয়ের দায়িত্ব কার ছিল, সংশ্লিষ্ট শাখা বা মানবসম্পদ বিভাগ কী পরীক্ষা করেছিল, নিয়োগ কমিটি কীভাবে অনুমোদন দিয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন। কারণ একটি জাল সনদ যদি নিয়োগের প্রথম ধাপেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়, তাহলে সেটি কয়েক বছর পর শনাক্ত হওয়ার অর্থ হলো প্রাথমিক যাচাই ব্যবস্থায় কোথাও না কোথাও বড় ধরনের ঘাটতি ছিল।

ইসলামী ব্যাংকের সাম্প্রতিক ঘটনাটি তাই একটি বৃহত্তর বাস্তবতার দিকেও ইঙ্গিত করছে। ২০২২ সালেই বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শিক্ষাগত সনদ যাচাইয়ের উদ্যোগ নিতে বলেছিল। নির্দেশনার পেছনে ছিল বিভিন্ন ব্যাংকে জাল সনদ ব্যবহার করে চাকরি করার অভিযোগ। অর্থাৎ সমস্যাটি নতুন নয়; নতুন হচ্ছে এখন এটি আরও দৃশ্যমানভাবে সামনে আসছে।

অন্য ব্যাংকেও অতীতে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। সোনালী ব্যাংকে ভুয়া সনদ ও অভিজ্ঞতার সনদ দেখিয়ে কম্পিউটার অপারেটর পদে নিয়োগ পাওয়া ৩২ জন পরবর্তীতে সহকারী মহাব্যবস্থাপক পদে উন্নীত হওয়ার ঘটনাও একসময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে তদন্তের কথাও প্রকাশিত হয়েছিল। এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, জাল সনদ শনাক্ত করতে ব্যর্থ হলে একজন কর্মী শুধু চাকরিতে টিকে থাকেন না, তিনি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে পদোন্নতির সিঁড়িও পেরিয়ে যেতে পারেন।

তবে অনুসন্ধানের স্বার্থে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি—কোনো কর্মীর বিরুদ্ধে জাল সনদ ব্যবহারের অভিযোগ ওঠা এবং কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ে সনদ জাল প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। তাই যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে, তাদের ক্ষেত্রে প্রামাণ্য নথি, সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়ন এবং প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত বক্তব্য দেওয়া উচিত। এতে একদিকে যেমন প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত হবে, অন্যদিকে নিরপরাধ কেউ মিথ্যা অভিযোগের শিকার হবেন না।

ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনর্গঠনের জন্য এখন প্রয়োজন কেবল কয়েকজনকে চাকরিচ্যুত করা নয়। প্রয়োজন নিয়োগের সময় সনদ যাচাই বাধ্যতামূলক করা, সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি সত্যতা নিশ্চিত করা এবং সন্দেহজনক সনদের ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে তদন্ত করা। একই সঙ্গে জাল সনদ শনাক্ত হলে শুধু কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নয়, নিয়োগের সময় যেসব পর্যায়ে যাচাইয়ের দায়িত্ব ছিল তাদের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা দরকার।

কারণ জাল সনদ দিয়ে একজন হয়তো একটি চাকরি পেয়েছেন, কিন্তু তাকে যাচাই না করে চাকরিতে রেখে দিলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো প্রতিষ্ঠান। আর ব্যাংকের ক্ষেত্রে সেই ক্ষতি শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে গ্রাহক, আমানতকারী এবং পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর।

ইসলামী ব্যাংকে ২১ জনের সনদ জাল হিসেবে শনাক্ত হওয়ার ঘটনা তাই একটি সতর্কবার্তা। এর পরবর্তী প্রশ্ন হওয়া উচিত—আর কতজনের সনদ যাচাই হয়নি? কতজনের সনদ যাচাইয়ের অপেক্ষায়? শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, দেশের অন্য ব্যাংকগুলোতেও কি একইভাবে পূর্ণাঙ্গ যাচাই হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত জাল সনদের এই অন্ধকার পুরোপুরি দূর হবে না।

ব্যাংকিং খাতে মেধা, যোগ্যতা ও সততার জায়গায় যদি জাল কাগজপত্র জায়গা করে নেয়, তাহলে ক্ষতি একজন ব্যক্তির নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা। তাই এখন প্রয়োজন লোক দেখানো শুদ্ধি অভিযান নয়, বরং নিয়োগ থেকে পদোন্নতি পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থায় স্বচ্ছ ও নথিভিত্তিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তাদের সার্টিফিকেট সত্যতা যাচাইয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে একটি ব্যাংকের এমডির পর্যন্ত চাকুরি চলে গেছে। আরো কয়েক শতাধিক কর্মকর্তা চাকুরি হারিয়েছে। এমনকি অনেকে জেল পর্যন্ত খেটেছে।

Please follow and like us:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top