loader image
শিরোনাম

মন্ত্রীর তদবিরে বদলে গেল ব্যাংক এমডি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুশাসন নিয়ে বড় প্রশ্ন

বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের পরও কিমিয়া সাদাতকে সরিয়ে কমিউনিটি ব্যাংকের এমডি হলেন ড. মোহাম্মদ ইমতিয়াজ আহমেদ

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ পুলিশের মালিকানাধীন তফসিলি ব্যাংক কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুশাসন, নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে। নিয়মকানুন অনুসরণ করে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কিমিয়া সাদাতকে নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার পরও শেষ মুহূর্তে সেই সিদ্ধান্ত বদলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন পাওয়ার পর কিমিয়া সাদাত ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে বিএনপি সরকারের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী মন্ত্রীর তদবিরে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। তাঁর পরিবর্তে পদ্মা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ইমতিয়াজ আহমেদকে কমিউনিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, ওই মন্ত্রীর পক্ষ থেকে মোহাম্মদ ইমতিয়াজ আহমেদের জীবনবৃত্তান্ত পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠানো হয় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে পুলিশের মহাপরিদর্শকের দপ্তর থেকে সেই জীবনবৃত্তান্ত কমিউনিটি ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো হয়। এরপরই পরিস্থিতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আসে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

অনুমোদনের পরও বদলে গেল সিদ্ধান্ত

কিমিয়া সাদাত তখন কমিউনিটি ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ তাঁকে পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনও পাওয়া যায় বলে জানা গেছে। ১৪ মে তাঁর পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক দিন আগে ৬ মে তিনি পদত্যাগ করেন। পদত্যাগপত্রে ব্যক্তিগত কারণের কথা উল্লেখ করা হলেও তাঁর পদত্যাগের পেছনে চাপ ছিল কি না, তা নিয়ে তখনই ব্যাংকপাড়ায় আলোচনা শুরু হয়।

কিমিয়া সাদাত নিজেও সে সময় চাপের বিষয়ে নিশ্চিত কিছু জানেন না বলে জানিয়েছিলেন। তবে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের একটি অংশের দাবি ছিল, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুরোধের পরই তিনি পদত্যাগ করেন।

এদিকে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এর পেছনে প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ ছিল।

ইমতিয়াজকে নিয়োগে তৎপরতা

কিমিয়া সাদাতের পদত্যাগের পর কমিউনিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে মোহাম্মদ ইমতিয়াজ আহমেদের নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়। তিনি এর আগে পদ্মা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ব্যাংকপাড়ায় আলোচনা রয়েছে, একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর তদবিরেই ইমতিয়াজ আহমেদের নাম সামনে আসে। তাঁর জীবনবৃত্তান্ত পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠানো এবং সেখান থেকে কমিউনিটি ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানোর ঘটনাও এ আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে।

অভিযোগ রয়েছে, পুরো প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত মোহাম্মদ ইমতিয়াজ আহমেদ ৩ আগস্ট কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

কিমিয়া সাদাতের নতুন ঠিকানা অন্য ব্যাংক

কমিউনিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তুতি থাকা কিমিয়া সাদাত শেষ পর্যন্ত ওই পদে যোগ দিতে পারেননি। কিছুদিন কর্মহীন থাকার পর তিনি অন্য একটি ব্যাংকে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের এক ধাপ নিচের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে যোগ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

এ ঘটনায় ব্যাংকপাড়ায় নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে একজন ব্যাংকারকে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর দায়িত্ব গ্রহণের ঠিক আগে তাঁর সরে যাওয়ার ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রশ্ন উঠেছে, যদি কিমিয়া সাদাত যোগ্য না হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল কেন? আর যদি তিনি যোগ্য হয়ে থাকেন, তাহলে শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কারণ কী?

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুশাসন নিয়েও প্রশ্ন

ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে কোনো প্রার্থীর নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ঘটনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।

ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, পরিচালনা পর্ষদের অনিয়ম, ঋণ অনিয়ম এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের অভিযোগ রয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এসব নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর ব্যাংকিং খাতে সংস্কার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার দাবি আরও জোরালো হয়।

এমন পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের সময়েও যদি ব্যাংকের শীর্ষ পদে নিয়োগে রাজনৈতিক তদবির ও প্রভাবের অভিযোগ ওঠে, তাহলে ব্যাংক খাতের সংস্কার কতটা কার্যকর হচ্ছে—সে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে।

একই এলাকায় বাড়ি, উঠছে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ

ব্যাংকপাড়ার সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আরও একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা রয়েছে। যে প্রভাবশালী মন্ত্রী মোহাম্মদ ইমতিয়াজ আহমেদের নিয়োগে তদবির করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, তাঁর বাড়ি এবং ইমতিয়াজ আহমেদের বাড়ি একই এলাকায় বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়টিকে কেন্দ্র করে মন্ত্রীর বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগও উঠেছে। যদিও একই এলাকার বাসিন্দা হওয়াই স্বজনপ্রীতির চূড়ান্ত প্রমাণ নয়, তবে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানোর অভিযোগের সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় তা নিয়ে ব্যাংকপাড়ায় আলোচনা তৈরি হয়েছে।

সংস্কারের পরিবর্তে ফের বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা

ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্বল সুশাসনের কারণে দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিরপেক্ষতা, ব্যাংক পরিচালনায় পেশাদারিত্ব এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে শীর্ষ কর্মকর্তা নিয়োগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

কিন্তু কমিউনিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগগুলো যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে তা ব্যাংক খাতের সংস্কার কার্যক্রমের জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে।

কারণ একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক শুধু একটি ব্যাংকের প্রশাসনিক প্রধান নন। তিনি ব্যাংকের ঋণনীতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বিক ব্যবসায়িক কৌশল বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে এ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব বা ব্যক্তিগত তদবিরের সুযোগ তৈরি হলে তার প্রভাব পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পড়তে পারে।

জবাব দিতে হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে

কমিউনিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের ঘটনা নিয়ে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নিয়ম মেনে অনুমোদিত একজন প্রার্থী দায়িত্ব নেওয়ার আগেই কেন সরে গেলেন এবং পরবর্তীতে নতুন একজনকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে?

একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে নতুন প্রার্থীকে অনুমোদনের ক্ষেত্রে কী কী বিষয় বিবেচনা করেছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপ ছিল কি না, থাকলে তা কীভাবে মোকাবিলা করা হয়েছে—সেটিও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

ব্যাংক খাতে সংস্কারের এই সময়ে ব্যক্তি বা ক্ষমতাবান মহলের প্রভাব নয়, বরং আইন, নীতিমালা, যোগ্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তই অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। তা না হলে বিগত সময়ের অনিয়মের সংস্কৃতি বদলে নতুন নামে একই ধরনের প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা থেকেই যাবে।

কমিউনিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ ঘিরে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা এখন তাই সময়ের দাবি। কারণ অভিযোগ সত্য হলে তা ব্যাংক খাতে সুশাসনের জন্য গুরুতর সতর্কবার্তা। আর অভিযোগ অসত্য হলে তথ্য-প্রমাণ দিয়ে তা পরিষ্কার করাও সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব।

ব্যাংক খাতের সংস্কারের মূল লক্ষ্য যদি সত্যিই সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয়, তাহলে নিয়োগের ক্ষেত্রে তদবির নয়—যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মই হতে হবে শেষ কথা।

Please follow and like us:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top