নিজস্ব প্রতিবেদক:
উদ্যোক্তা তৈরি করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, কর্মসংস্থান ব্যাংকের নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। অতিদরিদ্র, প্রান্তিক, সুবিধাবঞ্চিত, পিছিয়ে পড়া ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সোমবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে কর্মসংস্থান ব্যাংক আয়োজিত কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ক্ষুদ্র ব্যবসা, ক্ষুদ্রঋণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোগ তহবিল প্রকল্পের উদ্বোধন এবং ঋণের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ৫০ কোটি টাকার এ প্রকল্পটি একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ। অতিদরিদ্র, প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অনেকেই ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে সংকোচ বোধ করেন। তাদের আর্থিক কর্মকাণ্ডের আওতায় এনে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জাতীয় অর্থনীতিতে সম্পৃক্ত করতেই এ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকার সৃজনশীল অর্থনীতির ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রান্তিক পর্যায়ের সৃজনশীল মানুষদের শুধু ঋণ দিলেই হবে না, তাদের প্রশিক্ষণ, পণ্যের পরিচিতি তৈরি এবং বাজারজাতকরণের সুযোগ করে দিতে হবে। এর মাধ্যমে তাদের প্রতিভাকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
কর্মসংস্থান ব্যাংককে এ ধরনের আরও কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে ছড়িয়ে থাকা প্রতিভা ও সৃজনশীলতাকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। গানসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরও এগিয়ে আনার সুযোগ রয়েছে। তাদের সৃজনশীলতার অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করে বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে অর্থনীতির মূল স্রোতে নিয়ে আসতে চায় সরকার।
কর্মসংস্থান ব্যাংকের খেলাপি ঋণ নিয়েও কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ব্যাংকটির শ্রেণিকৃত ঋণের হার ৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ থেকে ২ শতাংশে নামিয়ে আনতে পারলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম আরও শক্তিশালী হবে এবং বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, কর্মসংস্থান ব্যাংক ভালো করছে এবং প্রতিষ্ঠানটি মুনাফাও করছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বিজন কান্তি সরকার বলেন, কর্মসংস্থান ব্যাংক পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কাজ করছে। এ জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকের সহযোগিতা অব্যাহত রাখা হলে তারা সমাজ ও অর্থনীতিতে এগিয়ে যাবে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশও এগিয়ে যাবে।
অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে এটি সারাদেশে আরও বিস্তৃত করা যেতে পারে। ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে কর্মসংস্থান ব্যাংকের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, দেশব্যাপী বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক এবং এ খাতে অর্জিত সাফল্যের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংকটিকে নির্বাচন করা হয়েছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের পাশাপাশি উদ্যোক্তা তৈরি, প্রশিক্ষণ এবং বাজারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব উদ্যোগ শুধু ঋণ বিতরণ ও আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং টেকসই উদ্যোগ গড়ে তোলা এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, কর্মসংস্থান ব্যাংকের বিদ্যমান অবকাঠামো ও মাঠপর্যায়ের দক্ষ জনবল কাজে লাগিয়ে দেশের প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে প্রকল্পের সুফল পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
সভাপতির বক্তব্যে কর্মসংস্থান ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ড. এ এফ এম মতিউর রহমান বলেন, প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করে আত্মকর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে এ প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রকল্পটি আরও বিস্তৃত ও কার্যকর করতে ঋণের সুদের হার কমানো, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য আর্থিক সহায়তার পরিধি বাড়ানো এবং অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে তিনি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
কর্মসংস্থান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অরুণ কুমার চৌধুরী বলেন, সরকার আগামী পাঁচ বছরে দেশে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়তা করতে কর্মসংস্থান ব্যাংক আগামী পাঁচ বছরে ৯ লাখ বেকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। চলতি অর্থবছরে দেড় লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে।
তিনি জানান, নতুন প্রকল্পের ঋণের সুদের হার ৬ শতাংশ। ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে কর্মসংস্থান ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনজিও বিষয়ক ব্যুরো, অর্থ মন্ত্রণালয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, দাতা সংস্থা, গণমাধ্যম এবং ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে দেশের অতিদরিদ্র, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উদ্যোক্তাদের জন্য কর্মসংস্থান ব্যাংকের নতুন ঋণ কর্মসূচি ‘ক্ষুদ্র ব্যবসা, ক্ষুদ্রঋণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোগ তহবিল’ প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়। পরে প্রকল্পের আওতাভুক্ত উদ্যোক্তাদের মধ্যে ঋণের চেক বিতরণ করা হয়।
