১০০০ রান-১০০ উইকেটের বিরল কীর্তির পর এবার বাংলাদেশের জয়ের নায়ক
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে মেহেদী হাসান মিরাজ এখন আর শুধু একজন অফস্পিনার নন, তিনি দলের অন্যতম নির্ভরতার প্রতীক। ব্যাট হাতে প্রয়োজনের সময় রান, বল হাতে গুরুত্বপূর্ণ উইকেট—দুই ভূমিকাতেই নিজেকে বারবার প্রমাণ করে চলেছেন এই অলরাউন্ডার। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশকে নিয়ে আসার পেছনেও তাঁর অবদান অসামান্য।
ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে মিরাজ আবারও দেখালেন কেন তিনি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম বড় সম্পদ। দুর্দান্ত নিয়ন্ত্রণ, ফ্লাইট, গতি ও টার্নের সমন্বয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপকে বিপাকে ফেলে পাঁচ উইকেট শিকার করেন তিনি। তাঁর বোলিংয়ের কাছেই শেষ পর্যন্ত ২৮৪ রানে গুটিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান।
এই পাঁচ উইকেটের পারফরম্যান্স মিরাজের টেস্ট ক্যারিয়ারের ধারাবাহিকতারই আরেকটি উজ্জ্বল উদাহরণ। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৫৮ টেস্টে তাঁর উইকেট সংখ্যা ২১৯ এবং পাঁচ উইকেটের সংখ্যা ১৪। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চলমান ম্যাচের পাঁচ উইকেট যোগ হলে তাঁর টেস্ট উইকেট সংখ্যা আরও বেড়েছে।
মিরাজের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি শুধু বল হাতে ম্যাচ জেতাতে পারেন না; ব্যাট হাতেও দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও প্রথম ইনিংসে তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে ৬৫ রান। সেই ইনিংস বাংলাদেশের লিডকে আরও বড় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রান করে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২২৮ রানের বিশাল লিড পায়।
টেস্ট ক্রিকেটে মিরাজের আরেকটি বড় অর্জন হলো ১০০০ রান ও ১০০ উইকেটের বিরল ডাবল। বাংলাদেশের মাত্র তৃতীয় ক্রিকেটার হিসেবে তিনি এই কীর্তি গড়েন। তাঁর আগে এই মাইলফলক স্পর্শ করেছিলেন সাকিব আল হাসান ও মোহাম্মদ রফিক। মিরাজ মাত্র ৩০ টেস্টে ১০০০ রান ও ১০০ উইকেটের ডাবল পূর্ণ করেন। এরও আগে মাত্র ২৪ টেস্টে ১০০ উইকেট নিয়ে তিনি বাংলাদেশের দ্রুততম বোলার হিসেবে এই মাইলফলক স্পর্শ করেছিলেন।
তবে মিরাজের গল্প শুধু পরিসংখ্যানের নয়। তাঁর উত্থান বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের পরিবর্তনের গল্পও। একসময় দলের প্রধান স্পিন অস্ত্র হিসেবে পরিচিত মিরাজ ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন প্রকৃত অলরাউন্ডার হিসেবে। নিচের সারির ব্যাটার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ রান করা থেকে শুরু করে প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারকে আউট করা—দুই ক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা ক্রমেই বেড়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চলমান টেস্টে সেই পরিণত মিরাজকেই দেখা গেছে। প্রথমে ব্যাট হাতে ৬৫ রান, এরপর বল হাতে পাঁচ উইকেট—এক ম্যাচে তাঁর অলরাউন্ড পারফরম্যান্স বাংলাদেশকে ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের মাটিতে এমন পারফরম্যান্স মিরাজের ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশ যখন অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের অপেক্ষায়, তখন মিরাজের ঘূর্ণি হয়ে উঠেছে সেই ইতিহাসের অন্যতম প্রধান কারিগর। ১০০০ উইকেট নয়—তার চেয়েও বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ ১০০০ রান-১০০ উইকেটের বিরল কীর্তি ইতোমধ্যে তাঁর নামের পাশে রয়েছে। আর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাঁচ উইকেটের নতুন অধ্যায় প্রমাণ করছে, মিরাজের সেরা গল্প হয়তো এখনো লেখা শেষ হয়নি।
