নিজস্ব প্রতিবেদক
নাগরিক নিরাপত্তা ও ব্যক্তির মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নে রাজধানীর বিডিবিএল ভবনে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ও গুম প্রতিরোধ আইন ২০২৬-এর খসড়া: প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলোচনায় সংসদ সদস্য, মানবাধিকারকর্মী, রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সংস্কার ও মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ভয়েস ফর রিফর্ম ও নাগরিক কোয়ালিশনের যৌথ উদ্যোগে এ সংলাপের আয়োজন করা হয়। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাবেক গুম কমিশনের সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস। আলোচনা সঞ্চালনা করেন ভয়েস ফর রিফর্মের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর।
আলোচনায় ব্যারিস্টার আরমান, শহিদুল আলম, নূর খান লিটন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, মুজিবুর রহমান মঞ্জু, ফয়সাল মাহমুদ, অনিক সেন, ডা. তাজনূভা জাবীন, গুমের শিকার ফাহাদ চৌধুরী দিপু, হাসিব হোসাইন ও জারিফ রহমানসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।
মূল প্রবন্ধে ড. নাবিলা ইদ্রিস জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬ এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-সংক্রান্ত নতুন আইনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য তুলে ধরেন। তাঁর মতে, তিনটি আইনেই আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে সেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকেই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদেরই কোনো না কোনোভাবে তদন্তের সঙ্গে যুক্ত করা হলে নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
তিনি বলেন, এ ধরনের ব্যবস্থা ভুক্তভোগী কিংবা সংশ্লিষ্ট বাহিনীর সদস্য—কাউকেই যথাযথ সুরক্ষা দেবে না। ক্ষমতা কোনো ব্যক্তির বা সরকারের জন্য চিরস্থায়ী নয় উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন, ভবিষ্যতে বর্তমান সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও এ ধরনের আইনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীতে পরিণত হতে পারেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রধান কৌঁসুলি মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, কোনো নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সেই বাহিনীকেই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, অপরাধের অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে, তারাই যদি তদন্তকারী হয়, তাহলে ন্যায়বিচার কীভাবে নিশ্চিত হবে।
তাজুল ইসলাম আরও বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে আইনে কারাদণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে। এতে গুমের মতো গুরুতর ঘটনার শিকার এবং আগে থেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত পরিবারগুলো অভিযোগ করতে আরও ভয় পাবে। ফলে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসার পথও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, বর্তমান সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো পরিকল্পনা বা ইচ্ছা না থাকলে এ ধরনের কঠোর ও বিতর্কিত আইন প্রণয়নের প্রয়োজন থাকার কথা নয়। তিনি ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু পুলিশ সদস্যের সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, অতীতে জঙ্গিবাদ দমনের যুক্তিতে মানবাধিকার সংকুচিত করার যে বয়ান দেওয়া হচ্ছে, তা প্রতিহত করা জরুরি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রধান ও অন্যান্য সদস্য নির্বাচনের জন্য গঠিত অনুসন্ধান কমিটিতে নয়জনের মধ্যে আটজনই সরকারি দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এর ফলে কমিশন পুরোপুরি রাজনৈতিক আনুগত্যশীল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এনপিএর অন্যতম সংগঠক অনিক সেন বলেন, প্রস্তাবিত দুটি আইন জুলাইয়ের আত্মত্যাগের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। খসড়া আইন পরিবর্তন না হলে জনগণের করের অর্থ ব্যয় করে নতুন একটি রাজনৈতিকভাবে অনুগত কমিশন গঠনের কোনো প্রয়োজন নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
মানবাধিকারকর্মী ও আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, নিরাপত্তা বাহিনী জনগণের করের অর্থে পরিচালিত হয়। তাদের প্রধান দায়িত্ব শুধু সরকার বা কোনো রাজনৈতিক দলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নয়, বরং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের পেশাদার হিসেবে স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশে কাজ করার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আরমান বলেন, নতুন দুটি আইনের খসড়া দেশে এখনো গভীর রাষ্ট্রের প্রভাব কতটা শক্তিশালী, তার প্রমাণ দেয়। তাঁর মতে, জনগণের ভোটে নির্বাচিত কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্ব স্বাভাবিকভাবে এ ধরনের আইন তৈরি করতে পারে না। তিনি বলেন, তাঁর দল অন্যান্য বিরোধী দলের সঙ্গে নিয়ে সংসদে খসড়া আইনের বিতর্কিত ধারাগুলো বাতিলের দাবিতে অবস্থান নেবে।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, মানবাধিকার রক্ষার জন্য গঠিত কোনো প্রতিষ্ঠান বা আইনের কার্যকারিতা নির্ভর করে তার স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহির ওপর। অভিযোগের তদন্ত যদি একই প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে, যার সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাহলে ভুক্তভোগীদের আস্থা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বিচার পাওয়ার পথও সংকুচিত হতে পারে।
তাদের মতে, গুম, নির্যাতন কিংবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত যেকোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের তদন্তে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ও অভিযোগকারীদের নিরাপত্তা এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত না করা হলে মানবাধিকার রক্ষার উদ্দেশ্যে প্রণীত আইনই উল্টো ভয়ের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
