কর্মঘণ্টা শেষ হওয়ার পর রাত ৮টার পর ন্যাশনাল ব্যাংকের গুলশান করপোরেট শাখায় ২২ কোটি ৬০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ অনুসন্ধানে ব্যাংকটির ১৬ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ‘মেসার্স ইমপ্যাক্ট কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড’-এর নামে অবৈধভাবে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগের অংশ হিসেবে তাদের বক্তব্য নেওয়া হবে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় থেকে সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। দুদকের উপপরিচালক মো. মোস্তাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে তলব করা কর্মকর্তাদের আগামী ৪ আগস্ট দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সশরীরে হাজির হয়ে বক্তব্য দিতে বলা হয়েছে।
তলব করা কর্মকর্তাদের মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংকের দিলকুশা শাখার এসভিপি আশরাফ উদ্দিন আহমেদ, কোম্পানি সেক্রেটারি মো. কায়সার রশীদ, ইভিপি ও বনানী শাখার ম্যানেজার অলোক কুমার বিশ্বাস এবং বনানী শাখার এসভিপি খান মুহাম্মদ মোয়েদ আজিজ রয়েছেন।
এ ছাড়া তালিকায় রয়েছেন কাজী কামাল উদ্দিন আহমেদ, হোসাইন আক্তার চৌধুরী, মো. মনিরুজ্জামান, জহির উদ্দিন আহমেদ, এসভিপি আশীষ কুমার লস্কর, ভিপি অরুন কুমার হালদার, সেলিমা আক্তার, রফিকুর আলম, মুর্শেদ কামাল, আবু জাকারিয়া, ভিপি মুনিরম চন্দ এবং ইভিপি জহিরুল ইসলাম।
দুদক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ন্যাশনাল ব্যাংকের গুলশান করপোরেট শাখায় নিয়মিত ব্যাংকিং সময়ের বাইরে রাত ৮টার পর ২২ কোটি ৬০ লাখ টাকা লেনদেনের ঘটনা ঘটে। এ লেনদেনের বৈধতা ও প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একই সঙ্গে মেসার্স ইমপ্যাক্ট কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের নামে অর্থ উত্তোলনের বিষয়টিও অনুসন্ধানের আওতায় আসে।
ঘটনাটি গড়ায় উচ্চ আদালত পর্যন্ত। কর্মঘণ্টার বাইরে গুলশান করপোরেট শাখায় এত বড় অঙ্কের লেনদেন কীভাবে সংঘটিত হলো, এর সঙ্গে কারা জড়িত এবং ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কী ভূমিকা পালন করেছেন—এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। এ ঘটনায় ন্যাশনাল ব্যাংকের গুলশান করপোরেট শাখার তৎকালীন ব্যবস্থাপককেও তলব করেছিলেন হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে আদালত গুলশান করপোরেট শাখায় সংঘটিত ওই লেনদেনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেন। আদালতের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি অনুসন্ধানে নামে দুদক। দুদকের অনুসন্ধানের অংশ হিসেবেই এখন ব্যাংকটির বিভিন্ন পর্যায়ের ১৬ কর্মকর্তাকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য তলব করা হয়েছে। তাদের কাছে লেনদেনের প্রক্রিয়া, অনুমোদন, সংশ্লিষ্ট হিসাব, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা এবং কর্মঘণ্টার বাইরে এত বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের কারণসহ বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চাওয়া হতে পারে।
বিশেষ করে ব্যাংকিং কার্যক্রমের নির্ধারিত সময়ের পর ২২ কোটি ৬০ লাখ টাকার মতো বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে যথাযথ অনুমোদন ও নিয়মানুবর্তিতা অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, অনুমোদন প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বও যাচাই করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
দুদক সূত্র বলছে, তলব করা কর্মকর্তাদের বক্তব্য গ্রহণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব, লেনদেনের নথি এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করা হবে। অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে শুধু তলব বা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অভিযোগে জড়িত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। অনুসন্ধানের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ, লেনদেনের বৈধতা এবং প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা যাচাইয়ের পরই দায় নির্ধারণ করা হবে।
ব্যাংকিং খাতে কর্মঘণ্টার বাইরে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের এ ঘটনা আর্থিক শৃঙ্খলা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার বিষয়টিকেও সামনে এনেছে। ব্যাংকের নির্ধারিত সময়ের বাইরে কোনো বড় অঙ্কের লেনদেন হলে সেটি কী প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয় এবং সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে কী ধরনের অনুমোদন প্রয়োজন—এসব বিষয়ও এখন দুদকের অনুসন্ধানে গুরুত্ব পাচ্ছে। কর্মকর্তাদের বক্তব্য গ্রহণের পর অনুসন্ধান কোন দিকে এগোয়, সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্ট মহলের। অভিযোগের প্রকৃত চিত্র উদঘাটনে কর্মকর্তাদের বক্তব্য, ব্যাংকের নথিপত্র এবং লেনদেনের তথ্য-উপাত্ত মিলিয়ে দেখবে দুদক।
