সম্পদ শনাক্ত ও ফেরাতে নিয়োগ ৮ আন্তর্জাতিক আইন ও পেশাদারি প্রতিষ্ঠান, ১২ দেশে প্রাথমিক অনুসন্ধান
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত থেকে খেলাপি ঋণের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করা হয়েছে—এমন সন্দেহে ৪২টি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টদের প্রায় ৩১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান করছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২০০ কোটি টাকার বেশি। বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা উদ্ধারে সহায়তা এবং দেশে অর্থ ফেরাতে আটটি আন্তর্জাতিক আইন ও পেশাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান রোববার এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নিয়োগ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিদেশে থাকা সম্পদের অবস্থান, ধরন ও মূল্য নির্ধারণ করবে। এরপর সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিয়োগ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্র্যান্ট থর্নটন, আরআই কনসোর্টিয়াম, বেকার ম্যাকেঞ্জি ও পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার ও ক্রল, ইওয়াই ও ডেন্টনস, রহমান রাভেলি ও ইন্টারপাথ, বিসিজি ও এইচএইচআর এবং অ্যানিমাস অ্যাসোসিয়েটস।
প্রাথমিকভাবে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড, হংকং, চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় থাকা সম্পদ অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়েছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব দেশে থাকা সম্পদের সন্ধান করবে।
এই উদ্যোগের সঙ্গে দেশে চলমান অর্থঋণ আদালতের মামলাগুলোরও সম্পর্ক রয়েছে। অর্থ পাচার ও ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে সরকার গঠিত যৌথ তদন্ত দলগুলো প্রথম ধাপে ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এসব বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল তদন্ত করছে।
কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য হলো বিদেশে কোনো সম্পদ শনাক্ত হলে আইনি প্রক্রিয়ায় তা জব্দ বা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া। পরবর্তীতে আদালতের মাধ্যমে সম্পদ বিক্রি বা অন্যভাবে নিষ্পত্তি করে পাওয়া অর্থ বাংলাদেশে ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর অনাদায়ী ঋণ আদায়ের চেষ্টা করা হবে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান ৩৮টি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে বিদেশে থাকা সম্পদ উদ্ধারের বিষয়ে বৈঠক করেন। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকগুলো ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে যাওয়া অর্থ উদ্ধারে কাজ করছে এবং এ প্রক্রিয়া দ্রুত করতে বিদেশি আইন প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হয়েছে। তাঁর মতে, অন্তত আইনি প্রক্রিয়ায় বিদেশে থাকা সম্পদ জব্দ করা প্রয়োজন, যাতে সংশ্লিষ্টরা সেগুলো বিক্রি বা অন্যত্র সরিয়ে ফেলতে না পারেন।
সরকারের বৃহত্তর অর্থপাচারবিরোধী উদ্যোগের অংশ হিসেবেই বিদেশে সম্পদ উদ্ধারের এ কার্যক্রম চলছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর পরিবারের সদস্য এবং তাঁদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে তদন্তে আসা কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে ১১টি যৌথ তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে। তদন্তের আওতায় থাকা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এস আলম, আরামিট, নাবিল, বেক্সিমকো, নাসা, সিকদার, বসুন্ধরা, সামিট, ওরিয়ন ও জেমকন রয়েছে।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশে-বিদেশে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ বা স্থগিত করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের ঋণ অনিয়মের অভিযোগে ছয়টি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কারণে ২৮টি ব্যাংক আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েছে বলে বিএফআইইউর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর মধ্যে ১১টি ব্যাংক বড় ঋণ ও খেলাপি ঋণের কেন্দ্রীভূত চাপের কারণে সংকটের কাছাকাছি চলে যায়।
এস আলম গ্রুপের ঋণের প্রভাব পড়েছে ১৩টি ব্যাংকে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংকের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকও রয়েছে। অন্যদিকে বেক্সিমকো গ্রুপের মোট ঋণের পরিমাণ ৫৩ হাজার ৪২ কোটি টাকা, যার মধ্যে জনতা ব্যাংক থেকেই নেওয়া হয়েছে ২৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ঋণই খেলাপি হয়েছে।
এ ছাড়া নাসা, সিকদার, ওরিয়ন ও আরামিট গ্রুপের ঋণও তদন্তের আওতায় রয়েছে। এসব ঋণের ঘটনায় ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের দুর্বলতা ও বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে।
২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিদেশি বিচারব্যবস্থার সহায়তায় আদালতের আদেশ বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে ২৩টি পারস্পরিক আইনি সহায়তা অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। সম্পদ উদ্ধারের ঘটনায় এ পর্যন্ত ১৪২টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং ছয়টি মামলায় রায় হয়েছে।
সংসদে গত ২২ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বাধীন টাস্কফোর্স চিহ্নিত ১১টি অগ্রাধিকার মামলায় পাচার করা অর্থ উদ্ধারে আইনি কার্যক্রম চলছে। এ ছাড়া শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির হিসাবে, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে বিদেশে স্থানান্তরিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়েছে। বছরে গড়ে এর পরিমাণ প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার।
বিদেশে পাচার করা অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের অর্থপাচারবিরোধী কার্যক্রমে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এখন এসব প্রতিষ্ঠানের অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কতটুকু সম্পদ শনাক্ত ও দেশে ফেরত আনা সম্ভব হয়, সেটিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
