বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে নিলাম ও আন্তঃব্যাংক লেনদেনে নতুন নির্দেশনা
নিজস্ব প্রতিবেদক
বৈদেশিক মুদ্রা বাজারের কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ, দ্রুত ও সুশৃঙ্খল করতে নিলাম, আন্তঃব্যাংক লেনদেন এবং গ্রাহক পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহের জন্য নতুন ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা চালু করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এই ব্যবস্থায় বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচার নিলাম থেকে শুরু করে আন্তঃব্যাংক লেনদেনের নিষ্পত্তি এবং বাজারের তথ্য সংগ্রহ ও রেফারেন্স বিনিময় হার তৈরির কার্যক্রম একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আগস্ট ২০২৬-এর নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য তিনটি। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে হস্তক্ষেপমূলক নিলাম পরিচালনা, অনুমোদিত ব্যাংকগুলোর মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন সম্পন্ন করা এবং রপ্তানি, আমদানি ও প্রবাসী আয়সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে রেফারেন্স বিনিময় হার প্রস্তুত করা।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, অনুমোদিত ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন পরিচালনায় বিভিন্ন দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। সামনের সারির কর্মকর্তারা বৈদেশিক মুদ্রা কেনাবেচা, নিলামে দরপ্রস্তাব দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় আদেশ সংশোধন বা বাতিলের কাজ করবেন। মধ্যম সারির কর্মকর্তারা ব্যবহারকারীর পরিচয় তৈরি, অনুমোদন, নিষ্ক্রিয় বা পুনরায় চালু করা এবং লেনদেনকারীদের সীমা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবেন। পেছনের সারির কর্মকর্তারা অর্থ ও বৈদেশিক মুদ্রা নিষ্পত্তি এবং প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্বে থাকবেন।
নিলামে দরপ্রস্তাবের নতুন পদ্ধতি
প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা কেনা বা বিক্রির নিলাম আয়োজন করতে পারবে। নিলামের আগে পরিমাণ, তারিখ, সময়, লেনদেনের ধরন, অংশগ্রহণের যোগ্যতা এবং অন্যান্য শর্ত জানিয়ে নোটিশ দেওয়া হবে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদিত ব্যাংকগুলো নিলামে দরপ্রস্তাব দিতে পারবে। প্রতিটি দরপ্রস্তাবে মার্কিন ডলারের পরিমাণ ন্যূনতম ৫ লাখ ডলার এবং এর গুণিতকে উল্লেখ করতে হবে। দরপ্রস্তাব দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তা যাচাই ও অনুমোদন করতে হবে।
নিলামের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক প্রাপ্ত দরপ্রস্তাবের ভিত্তিতে ফলাফল তৈরি করে ব্যাংকগুলোর মধ্যে বরাদ্দ দেবে। বরাদ্দ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে তা গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
তবে কোনো ব্যাংক দরপ্রস্তাবের পরিমাণ বা দর পরিবর্তন কিংবা তা বাতিল করতে চাইলে নির্ধারিত নিলাম সময়ের মধ্যেই করতে হবে। সময়সীমা শেষ হওয়ার পর এ ধরনের পরিবর্তন বা বাতিলের আবেদন গ্রহণ করা হবে না।
আন্তঃব্যাংক লেনদেনও হবে ইলেকট্রনিক ব্যবস্থায়
নতুন ব্যবস্থায় অনুমোদিত ব্যাংকগুলোর দৈনিক আন্তঃব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনও সম্পন্ন করতে হবে। তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তিযোগ্য ও ভবিষ্যৎ তারিখে নিষ্পত্তিযোগ্য লেনদেনের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকবে। এ ছাড়া বিনিময় চুক্তির লেনদেনও নির্ধারিত ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন হবে।
তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তিযোগ্য লেনদেনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ দুই কার্যদিবস পর্যন্ত নিষ্পত্তির সুযোগ থাকবে। ভবিষ্যৎ তারিখে নিষ্পত্তিযোগ্য লেনদেনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত মেয়াদ অনুযায়ী নিষ্পত্তির তারিখ নির্ধারিত হবে। প্রতিপক্ষ ব্যাংক লেনদেন গ্রহণ, সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠানো অথবা বাতিল করতে পারবে।
লেনদেন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও উভয় ব্যাংকের পেছনের সারির কর্মকর্তাদের দায়িত্ব থাকবে। এক পক্ষ বৈদেশিক মুদ্রা নিষ্পত্তির কার্যক্রম শুরু করবে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তা অনুমোদন করবেন। এরপর অন্য পক্ষ টাকা নিষ্পত্তির কার্যক্রম শুরু ও অনুমোদন করবে।
বিনিময় চুক্তিতে দুই ধাপে নিষ্পত্তি
বিনিময় চুক্তির লেনদেনে একটি লেনদেন কাছাকাছি সময়ে এবং অপরটি ভবিষ্যৎ তারিখে সম্পন্ন হয়। তাই এ ধরনের লেনদেনের সময় ভবিষ্যৎ ধাপের নিষ্পত্তিসংক্রান্ত তথ্যও দিতে হবে।
কাছাকাছি সময়ের নিষ্পত্তির দিন উভয় পক্ষকে বৈদেশিক মুদ্রা ও টাকা নিষ্পত্তি করতে হবে। পরবর্তীতে নির্ধারিত ভবিষ্যৎ তারিখে একইভাবে দ্বিতীয় ধাপের নিষ্পত্তি সম্পন্ন করতে হবে। উভয় পক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কার্যক্রম শেষ হলে নিষ্পত্তির অবস্থা সম্পন্ন হিসেবে দেখানো হবে।
দিনে তিন দফায় লেনদেনের তথ্য জমা
নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি কার্যদিবসে অনুমোদিত ব্যাংকগুলোকে গ্রাহক পর্যায়ের রপ্তানি, আমদানি ও প্রবাসী আয়সংক্রান্ত লেনদেনের তথ্য তিন দফায় জমা দিতে হবে। আন্তঃব্যাংক লেনদেন এ তথ্যের আওতায় থাকবে না।
সকাল ১১টা পর্যন্ত লেনদেনের তথ্য সকাল ১১টা ৩০ মিনিটের মধ্যে জমা দিতে হবে। বিকেল ৪টা পর্যন্ত লেনদেনের তথ্য বিকেল ৪টা ৩০ মিনিটের মধ্যে জমা দিতে হবে। আর বিকেল ৪টার পরের লেনদেন পরবর্তী কার্যদিবসের সকাল ১১টার মধ্যে জমা দেওয়া যাবে।
কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কোনো প্রতিবেদনযোগ্য লেনদেন না থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে শূন্য লেনদেনের প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। রেফারেন্স বিনিময় হার তৈরির জন্য সাধারণভাবে ১ লাখ মার্কিন ডলার বা তার বেশি পরিমাণের লেনদেনের তথ্য দিতে হবে। তবে মজুরি-ভিত্তিক প্রবাসী আয়সংক্রান্ত লেনদেনের ক্ষেত্রে লেনদেনের পরিমাণ বিবেচনা না করে প্রকৃত লেনদেনের তথ্য জমা দিতে হবে।
তথ্য জমায় নির্ধারিত ছক
ব্যাংকগুলো নির্ধারিত ছকে তথ্য জমা দিতে পারবে। নির্ধারিত ছকের বাইরে কোনো তথ্য গ্রহণ করবে না ব্যবস্থা। কোনো ব্যাংকের কোনো নির্দিষ্ট সময়ে লেনদেন না থাকলে ফাইল জমা না দিয়ে শূন্য লেনদেনের প্রতিবেদন দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
এ ছাড়া চাইলে ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা একাধিক লেনদেনের তথ্য আলাদাভাবে সরাসরি ব্যবস্থায় যুক্ত করতে পারবেন। পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এসব তথ্য যাচাই করে অনুমোদন করবেন। একাধিক তথ্যফাইল একত্র করে অনুমোদনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন এই ব্যবস্থা চালুর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা নিলাম, আন্তঃব্যাংক লেনদেন, অর্থ ও বৈদেশিক মুদ্রা নিষ্পত্তি এবং বাজারতথ্য সংগ্রহ একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আসবে। একই সঙ্গে নিয়মিতভাবে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে বৈদেশিক মুদ্রার রেফারেন্স বিনিময় হার প্রস্তুত ও প্রকাশের প্রক্রিয়াও আরও কাঠামোবদ্ধ হবে।
