বাংলাদেশ ব্যাংক যখন বন্ধ কারখানা খোলার উপায় খুঁজছে তখন এমন সিদ্ধান্তে প্রশ্ন উঠেছে!
নিজস্ব প্রতিবেদক
একসময় দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত এস আলম গ্রুপের শিল্পকারখানাগুলো এখন বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছে। কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতা, ব্যাংকিং সুবিধার সংকোচন এবং ঋণের চাপ—সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ও আনোয়ারা এলাকায় গ্রুপটির একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে শিল্পকারখানাগুলোর ভবিষ্যৎ, কর্মসংস্থান এবং ব্যাংকগুলোর বিপুল অঙ্কের ঋণ আদায় নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
গ্রুপটির বিভিন্ন সূত্র ও প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ও আনোয়ারা এলাকায় এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ, এস আলম কোল্ড রোল্ড স্টিলস, চেমন ইস্পাত, এস আলম স্টিল, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল, এস আলম অয়েল, এস আলম সিমেন্ট, এস আলম ব্যাগ ফ্যাক্টরি, এস আলম পাওয়ার প্ল্যান্ট, পাওয়ার জেনারেশন লিমিটেড এবং একটি ফিড মিলসহ প্রায় ১১টি কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোঃ আরিফ হোসেন খান বলেন, মিলকলকারখানা বন্ধের বিপক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক। আমরা যেকোনো মূল্যে কারখানা চালু করতে সবধরণের উপায় বের করে দিচ্ছি। ব্যাংকগুলোকে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া আছে। কিন্তু সরকার যখন কর্মসংস্থান তৈরিতে কাজ করছে তখন এস আলম গ্রুপের এ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। এ বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
কাঁচামাল নেই, এলসি সুবিধাও সংকুচিত
এস আলম গ্রুপের শিল্পকারখানাগুলোর বড় একটি অংশ আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ব্যাংক থেকে এলসি সুবিধা না পাওয়া কিংবা আমদানি অর্থায়ন ব্যাহত হলে উৎপাদন কার্যক্রম সরাসরি বাধাগ্রস্ত হয়। ২০২৪ সালে এস আলম রিফাইন্ড সুগার কারখানার কার্যক্রম বন্ধ থাকার সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, কাঁচামাল হিসেবে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করতে না পারায় কারখানায় সংকট তৈরি হয়েছিল। একইভাবে অপরিশোধিত তেল আমদানি ব্যাহত হওয়ায় এস আলম ভেজিটেবল অয়েল কারখানাও বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ কারখানা বন্ধের পেছনে শুধু কাঁচামালের সংকট নয়, এর সঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থার সংকট ও ঋণঝুঁকির বিষয়টিও গভীরভাবে জড়িত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শীর্ষ ২০ খেলাপির ১১টিই এস আলমের
এস আলম গ্রুপের আর্থিক সংকটের ব্যাপ্তি বোঝা যায় সরকারের প্রকাশিত শীর্ষ ঋণখেলাপিদের তালিকা থেকে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে জাতীয় সংসদে দেশের শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করা হয়। সেখানে ১১টি প্রতিষ্ঠানই এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে জানানো হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে—এস আলম সুপার এডিবল অয়েল, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল, এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ, এস আলম কোল্ড রোলড স্টিলস, সোনালি ট্রেডার্স, গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন, চেমন ইস্পাত, এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি, ইনফিনিট সিআর স্ট্রিপস, মুরাদ এন্টারপ্রাইজ এবং কর্ণফুলী ফুডস। এই তালিকা থেকে স্পষ্ট যে এস আলমের সমস্যা কেবল কয়েকটি কারখানা পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে দেশের ব্যাংকিং খাতে বিপুল পরিমাণ ঋণ ও খেলাপি ঋণের বিষয়টি সরাসরি যুক্ত।
ইসলামী ব্যাংকে বিপুল খেলাপি ঋণ
এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ব্যাংকগুলোর একটি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ৯২ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে এস আলম গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ৫৭ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা—যা ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৬২ শতাংশ। এ ধরনের ঋণ একদিকে ব্যাংকের সম্পদের মানকে দুর্বল করেছে, অন্যদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় অর্থায়নের সক্ষমতাকেও সংকুচিত করেছে।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকেও বড় অঙ্কের দায়
এস আলম-সংশ্লিষ্ট ঋণের আরেকটি বড় অংশ রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ব্যাংকটির মাধ্যমে এস আলম-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। এসব ঋণের বড় অংশ আদায়যোগ্য না হওয়ায় ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। একইভাবে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও এস আলম গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বড় অঙ্কের ঋণের তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ ব্যাংকটির মোট ঋণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এস আলম-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ৮৬ শতাংশ ঋণ
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও এস আলম গ্রুপের ঋণগ্রহণের মাত্রা ছিল অত্যন্ত বেশি। ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকের মোট ঋণের ৮৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ এস আলম ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো নিয়েছিল। মোট ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা।
একটি ব্যাংকের মোট ঋণের এত বড় অংশ কোনো এক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে কেন্দ্রীভূত হওয়া ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও করপোরেট গভর্ন্যান্স নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে।
জনতা ব্যাংকেও হাজার কোটি টাকার খেলাপি
এস আলম-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ শুধু ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জনতা ব্যাংকের একটি শাখায় এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা—এমন তথ্যও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। অর্থাৎ গ্রুপটির ঋণঝুঁকি সরকারি-বেসরকারি উভয় ধরনের ব্যাংকের ওপরই প্রভাব ফেলেছে।
কারখানা বন্ধ, কিন্তু ঋণের দায় থেকেই যাচ্ছে
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে গেলে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ হবে কীভাবে? একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে তার নগদ প্রবাহ বন্ধ হয়। উৎপাদন ও বিক্রি না থাকলে ঋণের কিস্তি, সুদ এবং অন্যান্য আর্থিক দায় পরিশোধের সক্ষমতাও কমে যায়। ফলে কারখানা বন্ধ হওয়া শুধু শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সংকট নয়; সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর ঋণ পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রেও এটি বড় ঝুঁকি। এস আলম গ্রুপের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি আরও বড়, কারণ সরকারের প্রকাশিত শীর্ষ ২০ খেলাপি প্রতিষ্ঠানের তালিকাতেই গ্রুপটির ১১টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরে কী?
এখন প্রশ্ন উঠছে, কাঁচামাল সংকট ও ব্যাংকিং সুবিধা না পাওয়ার কারণে কারখানা বন্ধ হচ্ছে—এটি কি কেবল ব্যবসায়িক ব্যর্থতার স্বাভাবিক পরিণতি, নাকি দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত ঋণনির্ভর সম্প্রসারণের ফল? কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি শিল্পগোষ্ঠীর কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে তার প্রভাব শুধু ওই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সম্পদমান, মূলধন, তারল্য ও আমানতকারীদের স্বার্থের ওপরও এর প্রভাব পড়ে। ফলে এস আলম গ্রুপের কারখানা বন্ধের কারণ, ব্যাংকিং সুবিধা সংকুচিত হওয়ার প্রক্রিয়া, ঋণের অর্থের ব্যবহার এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা—সবকিছুই এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার গভীর নজরদারির দাবি রাখে।
শিল্প সাম্রাজ্যের পতনের সংকেত?
একসময় ব্যাংকিং সুবিধা ও বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়া এস আলম গ্রুপের শিল্পকারখানাগুলো এখন যদি কাঁচামালের অভাব, অর্থায়ন সংকট ও ঋণের বোঝায় একের পর এক বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে এটি শুধু একটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সংকট নয়; দেশের ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত ঋণ কেন্দ্রীভূতকরণের ঝুঁকিরও একটি বড় উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। কারখানা বন্ধ হলে শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সরবরাহকারী ও পরিবহন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ব্যাংকের ঋণ আদায়ের সম্ভাবনাও কমে যায়। অন্যদিকে কারখানাগুলো সচল রাখতে হলে নতুন করে অর্থায়নের প্রয়োজন হতে পারে। ফলে ব্যাংকের সামনে তৈরি হয় দ্বিমুখী ঝুঁকি—অর্থায়ন করলে নতুন ঋণের ঝুঁকি, আর অর্থায়ন না করলে পুরোনো ঋণ আদায় আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা।
এস আলম গ্রুপের বর্তমান পরিস্থিতি তাই বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—বিপুল ঋণের ওপর দাঁড়ানো শিল্পসাম্রাজ্য যখন উৎপাদন চালাতে হিমশিম খায়, তখন সেই ঋণের দায় শেষ পর্যন্ত বহন করবে কে? আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এস আলমের কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত, ব্যাংকিং সুবিধা সংকট এবং বিপুল খেলাপি ঋণের পুরো চিত্রটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নজরদারির আওতায় আনা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
