আওয়ামী লীগ আমলে লাইসেন্স দিতে প্রথম উদ্যোগ, অন্তর্বতী সরকারে নতুন বিজ্ঞপ্তি আর বিএনপি সরকার চূড়ান্ত লাইসেন্স প্রদান করতে যাচ্ছে
মূলধন ১২৫ কোটি থেকে বেড়ে ৩০০ কোটি
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় তফসিলি ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেশি—অর্থনীতিবিদদের মুখে এমন মন্তব্য প্রায়ই শোনা যায়। এরই মধ্যে অনিয়ম ও দুর্নীতিতে বিপর্যস্ত পাঁচটি ইসলামী ধারার ব্যাংককে একীভূত করে একটি ব্যাংকে রূপান্তরের উদ্যোগও সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যালোচনাতেও অর্থনীতির আকারের তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা বেশি—এমন বাস্তবতা উঠে এসেছে। এর মধ্যেই বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে আটটি ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার পথে এগোচ্ছে। ফলে নতুন ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা ও এর যৌক্তিকতা নিয়ে ব্যাংকার ও সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্নও উঠেছে।
তিন বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা দেশের ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এবার বাস্তবায়নের পথে এগিয়েছে। দ্বিতীয় দফায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জমা পড়া ১২টি আবেদনের মধ্যে আটটি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য বাছাই করা হয়েছে। আগামী পর্ষদ সভায় এসব প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে। পর্ষদের অনুমোদনের পরই চূড়ান্ত লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।
প্রচলিত ব্যাংকের মতো ডিজিটাল ব্যাংকের কোনো শাখা, উপশাখা কিংবা নিজস্ব এটিএম নেটওয়ার্ক থাকবে না। গ্রাহক মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমে হিসাব খোলা, অর্থ জমা ও স্থানান্তর, পরিশোধ এবং ঋণের আবেদনসহ বিভিন্ন ব্যাংকিং সেবা নিতে পারবেন। ভার্চুয়াল কার্ড ও কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেনসহ প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন সেবাও দেওয়ার কথা রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো তুলনামূলক কম খরচে দ্রুত ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনা। বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, তরুণ উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী ডিজিটাল ব্যাংকের মাধ্যমে বেশি সুবিধা পেতে পারেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অভিজ্ঞ ব্যাংকার ও ব্যাংক এশিয়ার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী মনে করেন, ডিজিটাল ব্যাংক তরুণ প্রজন্মকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার পাশাপাশি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে পারে। নতুন ব্যাংকগুলোর প্রবেশে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মধ্যেও প্রতিযোগিতা বাড়বে। ফলে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক মডেল আধুনিকায়নের চাপ তৈরি হবে।
তবে নতুন ডিজিটাল ব্যাংকগুলোর সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তায় বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। নতুন প্রতিষ্ঠান হিসেবে শুরুতে পর্যাপ্ত আমানত সংগ্রহ কঠিন হতে পারে। গ্রাহকের তথ্যের নিরাপত্তা, প্রযুক্তি সম্পর্কে মানুষের সীমিত সচেতনতা এবং দেশের তুলনামূলক দুর্বল ডিজিটাল অবকাঠামোও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলালিংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জোহান বুসের মতে, দেশের আর্থিক বৈষম্য কমাতে ডিজিটাল ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাকিস্তানের জ্যাজক্যাশ, কেনিয়ার এম-পেসা এবং ভারতের একীভূত অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এসব দেশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশেও ডিজিটাল ব্যাংকিং, ক্ষুদ্রঋণ ও ক্ষুদ্রবিমার বিস্তার ঘটানো সম্ভব।
২০২৩ সালে শুরু, মূলধন বেড়ে ৩০০ কোটি
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সালের ১৪ জুন ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার নীতিমালা জারি করে। তখন একটি ডিজিটাল ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধনের ন্যূনতম পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছিল ১২৫ কোটি টাকা। প্রথম দফায় ৫২টি আবেদন জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে নয়টি প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদে উপস্থাপন করা হয় এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে অভিপ্রায়পত্র দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের জুনে নগদ ডিজিটাল ব্যাংক প্রথম চূড়ান্ত লাইসেন্স পেলেও পরবর্তীতে নগদকে ঘিরে আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ পাচারের অভিযোগ ওঠে। পরে ওই লাইসেন্স স্থগিত করা হয়। এর ফলে প্রথম দফার ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ কার্যত থেমে যায়।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট ডিজিটাল ব্যাংক নীতিমালা সংশোধন করে পরিশোধিত মূলধনের ন্যূনতম সীমা ১২৫ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ কোটি টাকা করা হয়। এরপর ২৬ আগস্ট নতুন করে আবেদন আহ্বান করা হলে দ্বিতীয় দফায় ১২টি প্রতিষ্ঠান আবেদন করে। এসব আবেদন যাচাইয়ের ক্ষেত্রে মূলধনের সক্ষমতা, উদ্যোক্তাদের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, সাইবার নিরাপত্তা এবং নিয়ন্ত্রক শর্ত পরিপালনের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় দফার প্রক্রিয়াতেও বিতর্ক তৈরি হয়। বিকাশকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার বিষয়ে তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের উদ্যোগ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের একটি অংশ প্রশ্ন তোলে। পরে নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার কথা জানান। এরপর দ্বিতীয় দফার আবেদনগুলোর মূল্যায়ন দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ডিজিটাল ব্যাংকের আবেদনকারী কারা:
দ্বিতীয় দফায় ১২টি প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ব্যাংকের জন্য আবেদন করেছে। এর মধ্য থেকে আটটির লাইসেন্স প্রদানের জন্য একটি তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোক্তা বা মালিকানা পরিচয় হলো—
১. বুস্ট
রবি আজিয়াটা লিমিটেডের উদ্যোগে প্রস্তাবিত এ ডিজিটাল ব্যাংক। রবি আজিয়াটা দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান এবং আজিয়াটা গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত।
২. নোভা ডিজিটাল ব্যাংক
বাংলালিংকের মূল প্রতিষ্ঠান ভিওন ও স্কয়ারের যৌথ উদ্যোগে প্রস্তাবিত। ফলে এতে টেলিযোগাযোগ ও শিল্প খাতের দুই উদ্যোক্তা গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ রয়েছে।
৩. মুনাফা ইসলামী ডিজিটাল ব্যাংক
আকিজ রিসোর্সেসের উদ্যোগে প্রস্তাবিত। আকিজ গোষ্ঠীর শিল্প ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এর উদ্যোক্তা কাঠামো যুক্ত।
৪. মৈত্রী ডিজিটাল ব্যাংক
ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান আশা বা এএসএর উদ্যোগে প্রস্তাবিত। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ক্ষুদ্রঋণ খাতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের।
৫. আমার ডিজিটাল ব্যাংক-২২
২২টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগে প্রস্তাবিত এ ডিজিটাল ব্যাংক।
৬. ৩৬ ডিজিটাল ব্যাংক
৩৬ জন উদ্যোক্তার উদ্যোগে প্রস্তাবিত ডিজিটাল ব্যাংক।
৭. ব্রিটিশ-বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক
দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে প্রস্তাবিত এ ব্যাংকের উদ্যোক্তা কাঠামোর বিস্তারিত তথ্য সীমিত।
৮. ডিজিটাল ব্যাংকিং অব ভুটান
ভুটানের ডিকে ব্যাংকের উদ্যোগে প্রস্তাবিত। বিদেশি ব্যাংক উদ্যোক্তার অংশগ্রহণের কারণে এটি দ্বিতীয় দফার আলোচিত আবেদনগুলোর একটি।
৯. অ্যাপ ব্যাংক
যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের উদ্যোগে প্রস্তাবিত।
১০. জাপান-বাংলা ডিজিটাল ব্যাংক
ডিবিএল গোষ্ঠীর উদ্যোগে প্রস্তাবিত।
১১. উপকারী ডিজিটাল ব্যাংক
আইটি সলিউশনস লিমিটেডের উদ্যোগে প্রস্তাবিত।
১২. বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংক
দেশের বড় মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান বিকাশের উদ্যোক্তা ও শেয়ারহোল্ডারদের উদ্যোগে প্রস্তাবিত।
তবে ১২টি আবেদন থেকে কোন আটটি প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়েছে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো আসেনি। ফলে পর্ষদের অনুমোদনের আগে নির্বাচিত আটটির নাম নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
প্রচলিত ব্যাংকেই যখন ডিজিটাল সেবা
নতুন করে আটটি ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে ব্যাংকারদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষও রয়েছে। তাদের মতে, দেশে কার্যরত তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ইতোমধ্যেই ব্যাপকভাবে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা দিয়ে আসছে। প্রায় প্রতিটি ব্যাংকেরই নিজস্ব মোবাইল অ্যাপ রয়েছে। এসব অ্যাপের মাধ্যমে হিসাব খোলা, অর্থ স্থানান্তর, বিল পরিশোধসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়া হচ্ছে। অনেক ব্যাংক অনলাইনে ঋণের আবেদন গ্রহণ ও ঋণ বিতরণের ব্যবস্থাও চালু করেছে।
ব্যাংকারদের প্রশ্ন, প্রচলিত ব্যাংকগুলো যখন দ্রুত ডিজিটাল সেবায় যাচ্ছে, তখন নতুন করে বিপুল মূলধনের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করে আলাদা আটটি ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার যৌক্তিকতা কতটা—তা নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে ডিজিটাল ব্যাংকের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের যুক্তি, শাখা-উপশাখা ও এটিএম ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং পরিচালনা করা গেলে পরিচালন ব্যয় কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নতুন গ্রাহক তৈরি, তরুণ উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যাংকিংয়ের আওতায় আনা এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
ফলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ডিজিটাল ব্যাংকের নতুন অধ্যায় শুরু হওয়ার অপেক্ষা এখন মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের পরবর্তী পর্ষদ সভার সিদ্ধান্তের ওপর। তবে নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিদ্যমান ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও গ্রাহকসেবার মান নিশ্চিত করাই হবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
