অ্যাকশনএইড-সানেমের গবেষণা প্রকাশ
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশের তরুণ কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ ও চাকরির নিরাপত্তা তাদের কর্মরত খাত এবং বসবাসের এলাকার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ফলে তরুণ কর্মীদের জন্য সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের নীতি গ্রহণ না করে খাতভিত্তিক ও অঞ্চলভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)-এর এক যৌথ গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার ঢাকায় আয়োজিত এক গবেষণা ফলাফল প্রকাশ ও আলোচনা অনুষ্ঠানে গবেষণার এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। গবেষণায় বলা হয়েছে, তৈরি পোশাক, কৃষি ও নির্মাণ খাতে কর্মরত তরুণদের তুলনায় পরিবহন খাতে কর্মরত তরুণদের নিরাপদ ও স্থিতিশীল কর্মসংস্থানের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতে কর্মরতদের অবস্থান তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে ভালো। তবে সামগ্রিকভাবে খাতটির কর্মসংস্থানের পরিস্থিতি ভালো হলেও অনেক পোশাকশ্রমিক এখনো চাকরির নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়েছেন।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও বন্যার মতো জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা এলাকায় বসবাস করা তরুণদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা আরও কমে যায়। লিঙ্গ বা কর্মখাতের পার্থক্য থাকলেও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস কর্মসংস্থানের সুযোগকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বিভিন্ন খাতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান শূন্য দশমিক ৫ শতাংশেরও কম হলেও দেশটি বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচকে সপ্তম অবস্থানে রয়েছে। দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কাজ করেন এবং এ খাত থেকে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে। অন্যদিকে, কৃষি খাতে দেশের মোট কর্মশক্তির প্রায় ৪১ শতাংশ নিয়োজিত। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির রূপান্তরের প্রভাব এসব খাতের তরুণ কর্মীদের ওপর বিশেষভাবে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গবেষণায় প্রচলিত ধারণার বিপরীতে দেখা গেছে, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার যতটা ব্যাপকভাবে তৈরি পোশাক খাতের কর্মসংস্থান কমিয়ে দিচ্ছে বলে ধারণা করা হয়, বাস্তবে চাকরি হারানোর হার ততটা বেশি নয়। তবে নির্মাণ খাতের শ্রমিকদের মজুরি ও কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতির ক্ষেত্রে সুরক্ষা প্রায় নেই বললেই চলে।
এ ছাড়া অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য বর্তমানে নির্ভরযোগ্য কোনো জাতীয় তথ্যভান্ডার নেই। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের জন্য সরকারি সহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তরুণ কর্মীরা কী ধরনের সহায়তা চান, সে বিষয়েও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। কর্মীদের মতে, নগদ সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং চাকরি খুঁজে পেতে সহায়তা তাদের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। বিপরীতে, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরের জন্য আর্থিক সহায়তা কিংবা নতুন ব্যবসা শুরুর জন্য মূলধন তাদের প্রধান অগ্রাধিকার নয়।
তবে সহায়তার ধরন খাতভেদে ভিন্ন। নির্মাণ খাতের তরুণ শ্রমিকরা নগদ সহায়তাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তৈরি পোশাক ও পরিবহন খাতের কর্মীরা চাকরি খুঁজে পেতে সহায়তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কৃষি খাতের তরুণ কর্মীরা নগদ সহায়তা ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের সমন্বিত ব্যবস্থা চান।
প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার ক্ষেত্রেও খাতভেদে পার্থক্য রয়েছে। কৃষি খাতের কর্মীদের মধ্যে সরকারের ওপর আস্থা সবচেয়ে বেশি। তৈরি পোশাক ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকরা তাদের নিয়োগকর্তার ওপর তুলনামূলক বেশি নির্ভরশীল। অন্যদিকে পরিবহন খাতের কর্মীদের মধ্যে শ্রমিক সংগঠনের ওপর আস্থা বেশি। ফলে তরুণ কর্মীদের কাছে সহায়তা পৌঁছে দিতে জাতীয় পর্যায়ে একই ধরনের প্রচারের পরিবর্তে খাতভিত্তিক যোগাযোগ কৌশল গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।
সানেমের কর্মসূচি পরিচালক জুবায়ের হোসেন বলেন, রূপান্তরের ঝুঁকিতে তরুণরা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকলেও একটি টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতিতে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তারাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণে তরুণদের কেন্দ্র করে প্রমাণভিত্তিক গবেষণা করা হয়েছে।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, ন্যায্য রূপান্তর এখন বৈশ্বিক ও জাতীয় উভয় পর্যায়েই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ খাতগুলোর ওপর ব্যাপক নির্ভরতার কারণে এ আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণার ফলাফল উপস্থাপনকারী সানেমের গবেষণা অর্থনীতিবিদ ফারহান খান বলেন, গবেষণার তথ্য সবার জন্য একই ধরনের সমাধানের ধারণাকে সমর্থন করে না। কোন খাতের তরুণ কর্মীদের কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, তা খাতভেদে ভিন্ন। তাই তাদের জন্য নেওয়া নীতি ও কর্মসূচি প্রণয়নের সময় তরুণ কর্মীদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
গবেষণাটি উপকূলীয়, নদীভাঙনপ্রবণ ও শহরাঞ্চলসহ জলবায়ু ঝুঁকির ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরতে দেশের নয়টি জেলার ৬২৫ জন তরুণ কর্মীর ওপর পরিচালিত হয়েছে। এতে মাঠপর্যায়ের ও অনলাইন জরিপের পাশাপাশি ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাক্ষাৎকার এবং অংশগ্রহণমূলক কর্মশালা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গবেষণা ফলাফল নিয়ে আলোচনায় সরকারি কর্মকর্তা, নিয়োগকর্তাদের সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আলোচনায় জাতীয় পর্যায়ে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণকে ভবিষ্যতে কোন খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং কোন খাতে কর্মসংস্থান কমবে—তার সঙ্গে সমন্বয় করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের সরকারি তথ্যভান্ডারে অন্তর্ভুক্ত করা, পলিটেকনিক শিক্ষার্থীদের গবেষণায় যুক্ত করা এবং কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীকে ভবিষ্যৎ গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি উঠে আসে।
অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ও অনুষ্ঠানের সভাপতি ফারাহ কবির বলেন, শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না, সেই প্রশিক্ষণের সঙ্গে বাস্তব কর্মসংস্থানের সুযোগ যুক্ত করতে হবে। নিয়োগকর্তাদের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কারিগরি প্রশিক্ষণ, অনানুষ্ঠানিক ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকদের জন্য শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা এবং ন্যায্য রূপান্তরের পরিকল্পনা প্রণয়নে তরুণদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
গবেষণার সার্বিক ফলাফল বলছে, বাংলাদেশের ন্যায্য ও টেকসই অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য তরুণ কর্মীদের শুধু সহায়তার সুবিধাভোগী হিসেবে দেখলে হবে না; বরং নীতি প্রণয়ন ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে তাদের মতামত ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
