loader image
শিরোনাম

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠায় ১০ দফা সংস্কার প্রস্তাব

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠায় ১০ দফা সংস্কার প্রস্তাব

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের ব্যাংকিং খাতে টেকসই স্থিতিশীলতা, আস্থা ও পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। শুধু নিয়ম-কানুন প্রণয়ন নয়, বরং ব্যাংকের অভ্যন্তরে সুশাসন, নৈতিক নেতৃত্ব, মেধাভিত্তিক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, স্বাধীন অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার জবাবদিহিতা বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রাহক ও আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও পেশাদারিত্ব প্রতিষ্ঠায় নিম্নোক্ত ১০ দফা সংস্কার প্রস্তাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

১. ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা

ব্যাংকিং খাতের সব পর্যায়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক আনুগত্যের পরিবর্তে আইন, নীতি, বিধিবিধান ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাব যেন প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

২. ভিন্নমত প্রকাশের নিরাপদ পরিবেশ (Speak-up Culture) নিশ্চিত করা

ব্যাংকের যেকোনো কর্মকর্তা যেন প্রতিহিংসা বা পেশাগত ক্ষতির আশঙ্কা ছাড়াই নীতিগত মতামত, সম্ভাব্য ঝুঁকি, অনিয়ম বা দুর্বলতা তুলে ধরতে পারেন—এমন সাংগঠনিক পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা ও গোপনীয় অভিযোগ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।

৩. মেধাভিত্তিক নিয়োগ, পদোন্নতি ও নেতৃত্ব নির্বাচন

নিয়োগ, পদোন্নতি এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আনুগত্য বা প্রভাব নয়; যোগ্যতা, সততা, কর্মদক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের সক্ষমতাকে প্রধান মানদণ্ড করতে হবে। এতে প্রতিষ্ঠানের প্রতি কর্মীদের আস্থা বাড়বে এবং দক্ষ নেতৃত্ব তৈরি হবে।

৪. প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় নৈতিক নেতৃত্বকে অগ্রাধিকার

ব্যাংকারদের প্রশিক্ষণে শুধু ব্যাংকিং আইন ও কারিগরি বিষয় নয়; নৈতিক নেতৃত্ব, করপোরেট গভর্ন্যান্স, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, পেশাগত স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের নৈতিকতা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির জন্য প্রশিক্ষণকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।

৫. পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার জবাবদিহিতা শক্তিশালী করা

পরিচালনা পর্ষদ ও নির্বাহী ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। পর্ষদের কমিটিগুলোকে আরও কার্যকর ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা বা অনিয়মের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা জরুরি।

৬. অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও নিরীক্ষার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা

অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা, কমপ্লায়েন্স ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ইউনিটকে প্রশাসনিক কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্ত রেখে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। এসব ইউনিটের পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা এবং সময়মতো বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।

৭. প্রশিক্ষণকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা

মানবসম্পদ উন্নয়নকে কেবল পরিচালন ব্যয় হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। ব্যাংকিংয়ের পরিবর্তিত বাস্তবতা, আন্তর্জাতিক মান, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্বের দক্ষতা বিবেচনায় আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

৮. কর্মদক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা

কর্মীদের মূল্যায়নে শুধু ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নয়; পরিমাপযোগ্য কর্মসম্পাদন, উদ্ভাবনী উদ্যোগ, সততা, কমপ্লায়েন্স, ঝুঁকি সচেতনতা এবং দলগত নেতৃত্বের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এতে স্বল্পমেয়াদি ফলাফলের পরিবর্তে টেকসই কর্মদক্ষতার ওপর গুরুত্ব বাড়বে।

৯. প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা

ব্যাংকিং কার্যক্রমে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ঋণ অনুমোদন, লেনদেন, ঝুঁকি শনাক্তকরণ ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। ডেটা অ্যানালিটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অস্বাভাবিক লেনদেন, সম্ভাব্য জালিয়াতি ও ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম দ্রুত শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তবে প্রযুক্তির ব্যবহারের পাশাপাশি তথ্যের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও সাইবার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

১০. গ্রাহকস্বার্থ, আমানতকারীর সুরক্ষা ও অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা

ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে গ্রাহক ও আমানতকারীর স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ব্যাংকের সেবা, চার্জ, সুদহার, ঋণসংক্রান্ত শর্ত ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সহজবোধ্য ও স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে। গ্রাহকের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য স্বাধীন ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি আমানতকারীর স্বার্থ সুরক্ষায় কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।

সংস্কারের মূল লক্ষ্য প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা ফিরিয়ে আনা

ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা কোনো একক উদ্যোগের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন নীতি, নেতৃত্ব, মানবসম্পদ, প্রযুক্তি, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিতার সমন্বিত সংস্কার। বিশেষ করে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে পেশাগত মূল্যবোধ ও নৈতিকতার চর্চা বাড়াতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংকের প্রকৃত শক্তি শুধু মূলধন, আমানত বা সম্পদের পরিমাণে নয়; বরং গ্রাহকের আস্থা, দক্ষ মানবসম্পদ, সুশাসন এবং ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। তাই ব্যাংকিং খাতকে আরও শক্তিশালী করতে হলে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীনির্ভর ব্যবস্থার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

একই সঙ্গে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচন, স্বাধীন অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, কার্যকর পরিচালনা পর্ষদ, নিরাপদ ‘স্পিক-আপ কালচার’ এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রশিক্ষণ ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করাও সময়ের দাবি।

সবশেষে, ব্যাংকিং খাতে সংস্কারের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শুধু অনিয়ম শনাক্ত বা শাস্তি প্রদান নয়; বরং এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি তৈরি করা, যেখানে অনিয়মের সুযোগ কমবে, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবেশ তৈরি হবে এবং কর্মকর্তারা পেশাগত স্বাধীনতা ও নৈতিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।

সুশাসন, পেশাদারিত্ব, জবাবদিহিতা ও প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতার সমন্বিত প্রয়োগই পারে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে আরও স্থিতিশীল, আস্থাশীল ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে।

Please follow and like us:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top