নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে কাজ পাওয়া বিদেশি কোম্পানির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাংক গ্যারান্টি বা স্ট্যান্ডবাই লেটার অব ক্রেডিট (এসবিএলসি) দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় অংশীদারদের জন্য সুযোগ বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন বিদেশি কোম্পানির কৌশলগত অংশীদার, স্থানীয় এজেন্ট বা অনুমোদিত প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী দেশের বাসিন্দা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে বৈদেশিক মুদ্রায় ব্যাংক গ্যারান্টি বা এসবিএলসি ইস্যু করতে পারবে অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ-১ থেকে জারি করা এক পরিপত্রে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। এতে স্থানীয় প্রকল্প কর্তৃপক্ষ বা ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে দেশের বাসিন্দা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বৈদেশিক মুদ্রায় গ্যারান্টি বা এসবিএলসি ইস্যুর সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দরপত্রে বিদেশি কোম্পানির অংশগ্রহণ সহজ করার পাশাপাশি তাদের স্থানীয় কৌশলগত অংশীদার ও প্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।
পরিপত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বাস্তবায়নাধীন বিভিন্ন প্রকল্পে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে বিদেশি কোম্পানি চুক্তি বা কার্যাদেশ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ, বিভাগ, সংস্থা, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, প্রকল্প বা ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান কিংবা যথাযথভাবে অনুমোদিত অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে দরপত্র জামানত, কার্যসম্পাদন নিশ্চয়তা বা এসবিএলসি প্রয়োজন হতে পারে। এসব প্রয়োজন মেটাতে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে বিদেশি কোম্পানির হয়ে প্রয়োজনীয় গ্যারান্টি বা এসবিএলসি আয়োজন করতে পারে, সে জন্য নতুন এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলো বিদেশি কোম্পানির আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে পাওয়া চুক্তি বা কার্যাদেশের বিপরীতে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প কর্তৃপক্ষ বা ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বৈদেশিক মুদ্রায় গ্যারান্টি বা এসবিএলসি ইস্যু করতে পারবে। তবে এ সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্ত মানতে হবে।
প্রথমত, সংশ্লিষ্ট চুক্তি বা কার্যাদেশে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ কিংবা ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের কাছে এ ধরনের ব্যাংক গ্যারান্টি বা এসবিএলসি গ্রহণের অনুমতি থাকতে হবে। অর্থাৎ মূল চুক্তির শর্তের সঙ্গে গ্যারান্টির ব্যবস্থা সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বিদেশি কোম্পানির প্রকৃত ও বৈধ বাণিজ্যিক বা চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক থাকতে হবে। এ সম্পর্কের পক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও প্রামাণ্য নথি থাকতে হবে। ফলে শুধু নামমাত্র প্রতিনিধি বা অনানুষ্ঠানিক সম্পর্কের ভিত্তিতে কোনো প্রতিষ্ঠান এ সুবিধা নিতে পারবে না।
তৃতীয়ত, গ্যারান্টি বা এসবিএলসি ইস্যুর ফলে ব্যাংকের যে আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হবে, তার যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য গ্যারান্টির ধরন ও সম্ভাব্য দায়ের পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে জামানত বা পাল্টা নিরাপত্তা নিতে হবে। ব্যাংক ও গ্রাহকের সম্পর্ক এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তির প্রকৃতি বিবেচনা করে এসব ব্যবস্থা নির্ধারণ করবে অনুমোদিত ডিলার ব্যাংক।
চতুর্থত, বিদেশি কোম্পানি ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার চুক্তিতে গ্যারান্টি বা এসবিএলসি ইস্যুর কারণে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের যে ব্যয়, দায় ও অন্যান্য খরচ হবে, তা যথাযথভাবে পরিশোধ বা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিশেষ করে গ্যারান্টি কার্যকর বা দাবি উত্থাপিত হলে বিদেশি কোম্পানি কীভাবে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে অর্থ পরিশোধ করবে, চুক্তিতে তার সুস্পষ্ট ব্যবস্থা থাকতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও নির্দেশ দিয়েছে, অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোকে নিজস্ব ঋণ অনুমোদন নীতিমালা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতি ও অন্যান্য সতর্কতামূলক মানদণ্ড অনুসরণ করে এ ধরনের গ্যারান্টি বা এসবিএলসি ইস্যু করতে হবে। একই সঙ্গে একক গ্রাহক বা ঋণগ্রহীতার ক্ষেত্রে নির্ধারিত সর্বোচ্চ ঝুঁকি গ্রহণসীমা মেনে চলতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ অথবা সংশ্লিষ্ট ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদনও নিতে হবে।
পরিপত্রে গ্যারান্টি কার্যকর হওয়ার পর অর্থ পরিশোধের বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কোনো গ্যারান্টি বা এসবিএলসির বিপরীতে দাবি উত্থাপিত হলে সাধারণভাবে তার অর্থ টাকায় সমপরিমাণ মূল্যে পরিশোধ করতে হবে। তবে সংশ্লিষ্ট দরপত্র বা চুক্তির নথিতে যদি স্পষ্টভাবে বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকে, তাহলে অনুমোদিত ডিলার ব্যাংক আরটিজিএস ব্যবস্থার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় সেই দাবি নিষ্পত্তি করতে পারবে।
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন এই নির্দেশনা আন্তর্জাতিক দরপত্রে বিদেশি কোম্পানির অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় অংশীদারদের কার্যক্রমকে আরও সহজ করতে পারে। বিশেষ করে বড় অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, যোগাযোগ ও সরকারি ক্রয় প্রকল্পে বিদেশি ঠিকাদারদের সঙ্গে কাজ করা স্থানীয় এজেন্ট ও অংশীদারদের ব্যাংক গ্যারান্টি ব্যবস্থাপনায় এ সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রায় গ্যারান্টি ইস্যুর ক্ষেত্রে ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে একদিকে আন্তর্জাতিক প্রকল্পে ব্যবসার সুযোগ সম্প্রসারিত হবে, অন্যদিকে যথাযথ জামানত, পাল্টা নিরাপত্তা, চুক্তিগত দায়বদ্ধতা ও ব্যাংকের নির্ধারিত ঝুঁকি সীমার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা-সংক্রান্ত সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিক দরপত্রে বিদেশি কোম্পানি ও তাদের স্থানীয় অংশীদারদের জন্য ব্যাংকিং সেবা সহজীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশি অংশীদারদের হয়ে আর্থিক নিশ্চয়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের দায়, ঝুঁকি ও ক্ষতিপূরণের বিষয়গুলো চুক্তিতে স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করার সুযোগও তৈরি হলো।
