loader image
শিরোনাম

শেখ হাসিনাকে প্ল্যাটফর্ম দেওয়ায় ভারতের প্রতি ঢাকার নজিরবিহীন ক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক

ভারতের মাটিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়ায় নজিরবিহীন ক্ষোভ ও কড়া ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনাকে ‘পলাতক’, ‘দণ্ডিত’ ও ‘গণহত্যাকারী’ হিসেবে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বাংলাদেশের জনগণ ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাঁর বিষোদ্গার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

বিবৃতির শুরুতেই শেখ হাসিনাকে ‘পলাতক দণ্ডিত গণহত্যাকারী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহকে ‘জুলাই বিপ্লব’ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জনগণ জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকী পালন করছে। এমন একটি দিনে ভারতীয় মাটিতে শেখ হাসিনার মতবিনিময়ের আয়োজন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি ‘চরম অবমাননা’ এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি ‘গুরুতর অসম্মান’।

বিবৃতিতে বলা হয়, ভারত সরকারকে আগে থেকেই এ বিষয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছিল। এরপরও শেখ হাসিনাকে এই গণমুখী অনুষ্ঠানে বক্তব্য ও মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়ায় ঢাকা গভীরভাবে খেদ প্রকাশ করছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষায়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ফ্যাসিবাদী সরকারের শিশুসহ নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চালানো নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জাতিসংঘ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সত্যকে অস্বীকার করার যে কোনো প্রচেষ্টা শেখ হাসিনা ও তাঁর ‘অপরাধী চক্রের’ ইতিহাসকে উল্টে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা। বাংলাদেশের জনগণ অতীতেও এ ধরনের প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং এখনও তা করে চলেছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিবৃতিতে সবচেয়ে কঠোর ভাষার ব্যবহার করা হয়েছে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় অবস্থান প্রসঙ্গে। বলা হয়েছে, জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে সমুন্নত রেখে বাংলাদেশের জনগণ দৃঢ়ভাবে সংকল্পবদ্ধ—দেশ আর কখনোই ‘ফ্যাসিবাদের অন্ধকার দিনে’ ফিরে যাবে না। একই সঙ্গে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ কখনোই বশ্যতা স্বীকারকারী রাষ্ট্র (client state) হবে না।’

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বক্তব্যকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, রাজনৈতিক পরিসরে জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহকে ‘বিপ্লব’ না ‘অভ্যুত্থান’—এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মতপার্থক্য রয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে জুলাইকে ‘বিপ্লব’ না বলে ‘অভ্যুত্থান’ বা ‘আন্দোলন’ হিসেবে উল্লেখ করার কথা বলা হলেও এবার সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সরাসরি ‘জুলাই বিপ্লব’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।

শুধু তাই নয়, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থানও বিবৃতিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, দণ্ডিত শেখ হাসিনা এবং তাঁর ‘মাফিয়া চক্রের’ জন্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে আর কোনো স্থান থাকবে না। তবে একই সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ককে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান না করে সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং জাতীয় মর্যাদার ভিত্তিতে একটি গঠনমূলক, পারস্পরিক সুবিধাজনক ও দূরদর্শী সম্পর্ক বজায় রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে ঢাকা।

শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর প্রসঙ্গেও ভারতকে সরাসরি দায়ী করেছে বাংলাদেশ। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় দণ্ডিত অপরাধী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারত সরকারের কাছে বারবার অনুরোধ জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

এর বিপরীতে, কোনো উসিলায় শেখ হাসিনাকে গণমাধ্যমের সঙ্গে খোলামেলা মতবিনিময়ের সুযোগ করে দেওয়া বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতির জন্য ‘গভীরভাবে বেদনাদায়ক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিকাশের ক্ষেত্রেও ক্ষতিকর।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বিবৃতির মধ্য দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের মধ্যে ঢাকার অবস্থান আরও কঠোর ও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। একদিকে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত পাঠানোর দাবি অব্যাহত রাখার কথা বলা হয়েছে, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে সার্বভৌম সমতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতিকে সামনে আনা হয়েছে।

সব মিলিয়ে শেখ হাসিনাকে ভারতে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার ঘটনায় ঢাকার প্রতিক্রিয়ায় ‘সার্বভৌমত্ব’, ‘জুলাই বিপ্লব’ এবং ‘client state’—এর মতো শব্দের ব্যবহার বাংলাদেশের বর্তমান কূটনৈতিক অবস্থানের কঠোরতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

Please follow and like us:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top