loader image
শিরোনাম

বেঈমানী, বিভক্তি ও পতনের পথে আজকের মুসলিম 

ড. ফিরোজ মাহবুব কামাল

কোনটি নিশ্চিত সাফল্যের পথ এবং কোনটি নিশ্চিত ব্যর্থতার – সেটি স্পষ্ট করতেই পবিত্র কুর’আন এসেছে বার বার আলোচনা। মহান আল্লাহ তায়ালা চান, কেউ যেন এ দুটি পথ চিনতে সামান্যতম ভুল না করে। কারণ, সে ভুলই হলো মানব জীবনে সবচেয়ে বড় ভুল -যা এ জীবনের পুরা বাঁচাটাই ব্যর্থ করে দেয়। সে ভুলের অর্থ নিশ্চিত জাহান্নামে পৌঁছা। এ পৃথিবী পৃষ্ঠে সেই সবচেয়ে বড় অজ্ঞ, যে ব্যক্তি এক্ষেত্রে ভুল করে। আজ স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, ডিগ্রিধারীদের সংখ্যাও বেড়েছে, কিন্তু সে অজ্ঞতা কমেনি। অথচ যখান কোন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসা ছিল না, তখন নিশ্চিত সাফল্যের পথটি বেছে নিতে এবং অনিবার্য ব্যর্থতার পথ থেকে বাঁচতে প্রাথমিক যুগের মুসলিমরা ভুল করেনি। নবীজী (সা:)’য়ের হাদীস, মানব ইতিহাসের তারাই সর্বত্তোম মানব। তাদের মধ্য থেকেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ জান্নাতে যাবে। 

নিশ্চিত সে সাফল্যের পথটি হলো, মহান রব’য়ের আজ্ঞাবহ খলিফা রূপে বাঁচার পথ। সে পথটি হলো, মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে বিজয়ী করার লক্ষ্যে জিহাদের পথ। সে জিহাদের লক্ষ্য হয়, দুর্বৃত্তি ও অবিচারের নির্মূল এবং ন্যায় ও সুবিচারের প্রতিষ্ঠ। সে জিহাদে থাকে অর্থ, শ্রম, মেধা, রক্ত তথা সর্ব সামর্থ্যের বিনিয়োগ ও শাহাদতের তাড়না। এ সাফল্যের পথে বড় মাইল ফলক হলো ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা -যা পরিণত মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে বিজয়ী করার হাতিয়ারে। অপর দিকে অনিবার্য ব্যর্থতার পথটি হলো, মহান রব’য়ের এজেন্ডা ও হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পথ। সে পথটি যেমন মূর্তিপূজা, লিঙ্গপূজার ন্যায় পৌত্তলিকতা হতে পারে, তেমনি হতে পারে জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ, সেক্যুলারিজম, কম্যুনিজম ইত্যাদি মতবাদী রাজনীতির -যার লক্ষ্য ইসলামের বিজয়কে প্রতিহত করা। বাংলাদেশের ন্যায় অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রে বিজয় পেয়েছ ব্যর্থতার পথটি। অধিকাংশ মানুষ নিজেদের মুসলিম রূপে দাবী করলেও মহান রব’য়ের সার্বভৌমত্ব, তাঁর  শরিয়া ও কুর’আনী রোডম্যাপের কোন স্থান নাই। মানুষ এখানে দুর্বৃত্তির নির্মূল ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদ নিয়ে বাঁচে না, বরং বাঁচে দুর্বৃত্তির প্লাবনে হাবু ডুবু খেয়ে। ভোট দিয়ে, রাজস্ব দিয়ে এবং রাজপথে লাঠি ধরে তাদেরই বিজয়ী করে যারা ইসলামকে পরাজিত রাখার রাজনীতি করে। এভাবে অধিকাংশ মানুষ ধেয়ে চলছে জাহান্নামের পথে।  

সাফল্যের পথটি কোন আবিষ্কারের বিষয় নয়, এটি অনুসরণের পথ। পুরোপুরি অনুসরণ করতে হয় নবীজী (সা:)’য়ের অনুসৃত পথকে। কারণ, একমাত্র নবীজী (সা:)’য়ের পথটি হলো সিরাতাল মুস্তাকীম। সে সার্টিফিকেট এসেছে মহান রব থেকে। পবিত্র কুর’আনের কসম খেয়ে বলেছেন:

وَالْقُرْآنِ الْحَكِيمِ

إِنَّكَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ

عَلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ

অর্থ: “প্রজ্ঞাময় কোরআনের কসম।

নিশ্চয় আপনি প্রেরিত রসূলগণের একজন।

সরল পথে প্রতিষ্ঠিত।” -(সুরা ইয়াছিন, আয়াত ২-৪)।

তাই যারা এ জীবনে সফল হতে চায় অর্থাৎ জান্নাত পেতে চায়, তাদেরকে শুধু পবিত্র কুর’আন বুঝলে চলে না, নবীজী (সা:)’য়ের জীবনীও জানতে হয়। এবং পদে পদে নিজের জীবনকে নবীজী (সা:)’য়ের জীবনের সাথে মিলিয়ে দেখতে হয়। এ পথে কুর’আনের গভীর অধ্যয়ন ও অনুসরণ আছে, দ্বীনের প্রচার আছে, দখলদার দুর্বৃত্ত শক্তির বিরুদ্ধে জিহাদ আছে এবং ইসলামী রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা আছে। এর কোনটিকে বাদ দেয়ার অর্থ সিরাতাল মুস্তাকীম থেকে বিচ্যুত হওয়া। পরিতাপের বিষয় হলো, আজকের মুসলিমগণ এর কোনটিতেই নাই। তাদের না আছে কুর’আন বুঝায় আগ্রহ, না আছে দ্বীনের দাওয়াতে, না আছে দুর্বৃত্ত শক্তির নির্মূলের জিহাদে। এবং না আছে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জিহাদ। অর্থাৎ মুসলিমগণ ইসলাম পালন করছে নবীজী (সা:)কে অনুসরণ না করেই। তাদের জীবনে মহান রব’য়ের এজেন্ডার কোন স্থান নাই। 

অনেকে কুর’আন বুঝার উপর গুরুত্ব দেয়, কিন্তু গুরুত্ব দেয় না নবীজী (সা:)’য়ের হাদীসকে। বুঝতে হবে এরা বিভ্রান্ত; এরা নাই সিরাতাল মুস্তাকীমের উপর। এ নিয়ে বিতর্ক নাই যে, বহু হাজার হাদীস জাল। কিন্তু সব হাদীসকে জাল বলাটি হবে ভয়ানক মিথ্যা। কিছু জাল হাদীসকে ভিত্তি বানিয়ে সকল হাদীসকে বর্জন করলে ইসলাম অনুসরণের কাজটি হবে না। তাতে সৃষ্টি হবে গুরুতর ফিতনা। শয়তান সে ফিতনাই চায়। বস্তুত হাদীসেদের সত্যতা বিচার করতে হবে কুর’আনের আলোকে এবং সঠিক হাদীসকে অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। কুর’আনের আয়াতগুলি নাযিলের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট আছে। কুর’আন বুঝতে হলে সে প্রেক্ষাপটগুলি জানতে হয়। আর সে প্রেক্ষাপটের বর্ণনা এসেছে সাহাবীদের পক্ষ থেকে।  পবিত্র কুর‌’আনে নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাতের নির্দেশ এসেছে, কিন্তু সেগুলি কিভাবে পালন করতে হবে -সে বিবরণ কুর’আনে নাই। সেগুলি শিখিয়েছেন নবীজী (সা:)। এবং নবীজী (সা:)কে সেগুলি শিখিয়েছেন মহান রব’য়ের পক্ষ থেকে হযরত জিবরাইল (আ:)। নবীজী (সা:)’য়ের সূন্নাহ ও হাদীসকে বাদ দিয়ে তাই ইসলাম পালন অসম্ভব। 

অতীতের সাফল্য ও আজকের ব্যর্থতা: হেতু কী?      

প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ যে কারণে সাফল্যের পথটি বেছে নিতে ভুল করেননি তার কারণ, তাদের হাতে ছিল মানব ইতিহাসের সর্বশ্রষ্ঠ টেক্সটবুক – পবিত্র কুর’আন। মহান আল্লাহতায়ালা তাঁর নিজের এ কিতাবের ছত্রে ছত্রে সাফল্যের পথটির পরিচিতি তুলে ধরেছেন এবং জান্নাতের পথ দেখিয়েছেন। এজন্যই পবিত্র কুর’আন হলো সিরাতাল মুস্তাকীম। প্রাথিমক যুগের মুসলিমদের সাফল্যের মূল কারণ তারা ছিলেন সিরাতাল মুস্তাকীমের উপর। আর আজকের মুসলিমদের ব্যর্থতার মূল কারণ, তারা বিচ্যুত হয়েছে সিরাতাল মুস্তাকীম থেকে। তাদের ধর্মপালন, রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি, শিক্ষা সংস্কৃতি, আইন আদালত চলছে ভ্রান্ত পথে। সাহাবায়ে কিরাম এ কিতাব পড়তেন এবং আন্দোলিত হতেন। এবং পবিত্র এ কিতাব থেকে তাঁরা ঈমানের খাদ্য পেতেন। সেটি উল্লেখ এসেছে পবিত্র কুর’আনেও। বলা হয়েছে:

وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَىٰ رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ

অর্থ: “আর যখন তাদের সামনে পাঠ করা হয় কালাম, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা স্বীয় রব’য়ের প্রতি ভরসা পোষণ করে।” –(সুরা আনফাল, আয়াত ২)।

কুর’আন থেকে ঈমানের খাদ্য পেতে হলে তো কুর’আন বুঝতে হয়। যারা কুর’আন পড়ে না, পড়লেও বুঝে না -তারা কুর’আন থেকে ঈমানের পুষ্টি পাবে কিরূপে? আর পুষ্টি না পেলে তো ঈমান মারা যেতে বাধ্য। অথচ সাহাবাগুণ কুর’আনের গুরুত্ব বুঝতেন। ক্ষুধার্তদের ন্যায় সাহাবাগণ নবীজী (সা:)’য়ের কাছে বার বার ছুটে আ’সতেন এটি জানতে, মহান রব”য়ের পক্ষ থেকে নতুন কোন বাণী নাযিল হয়েছে কিনা? নতুন বাণী এলে সেটি তারা মুখস্থ করে নিতেন এবং সে অনুযায়ী আমল করতেন। তখন কুর’আন কিতাব আকারে ছিল না, কিন্তু সাহাবাগণ কুর’আনকে হৃদয়ে ধারণ করতেন। অথচ আজ কুর’আন বিশ্বের নানা ভাষায় কিতাবে রয়ে গেছে, কিন্তু মুসলিমদের হৃদয়ে স্থান পায়নি। স্থান পায়নি তাদের আমল ও আচরণেও। তাছাড়া সাহাদের সামনে ছিলেন নবীজী (সা:)’য়ের ন্যায় পবিত্র কুর’আনের শো’কেস -যার চরিত্র, কর্ম ও আচরণের মধ্যে পবিত্র কুর’আন দেখা যেত। ফলে সাহাবাদের মাঝে দেখা যেত পদে পদে নবীজী (সা:)’য়ের অনুসরণের তাড়না।  

মহান রব’য়ের দেয়া পবিত্র এ টেক্সটবুক থেকে পাঠ নিতে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হওয়া লাগে না, পাঠ নেয়া যায় নিজ গৃহে. মসজিদে, দোকানে, নদীর তীরে বা গাছের নিচে বসেও। যেহেতু একমাত্র পবিত্র কুর’আন দেখায় সাফল্যের পথ, ফলে কুর’আন পাঠ এবং কুর’আন বুঝা মহান রব প্রতিটি নর-নারীর উপর ফরজ করেছেন। এ জন্যই ইসলামে শ্রেষ্ঠ ইবাদত হলো কুর’আন বুঝা এবং কুর’আনের জ্ঞানকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া। এখান থেকেই ইসলামের মিশনের শুরু। ইবাদতের এ প্রথম ধাপটিকে এড়িয়ে পূর্ণ ইসলাম পালনের কাজটি কখনোই সঠিক হয়না। নবুয়তের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই নবীজী (সা:) এ কাজটি লাগাতর করেছেন। সে কাজে সাহাবাদেরও উৎসাহিত করেছেন। যে সমাজে এ কাজটি বেশি বেশি হয়, সে সমাজে  সাফল্যের পথে চলা মানুষের সংখ্যা অধীক হয়। এমন সমাজে সম্ভাবনা বাড়ে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের। নইলে বাড়ে পথভ্রষ্ট ব্যর্থ মানুষের সংখ্যা। একটি রাষ্ট্রে সেটি বুঝা যায় মহান রব’য়ের সার্বভৌমত্ব ও শরিয়ার বিলুপ্তি এবং ইসলাম বিরোধী শক্তির বিজয় দেখে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি উত্তম দৃষ্টান্ত।  

জান্নাতের পথটি হলো মহান আল্লাহ তায়ালার সাথে অটুট সম্পর্কের পথ। কিরূপে সম্ভব সে অটুট সম্পর্ক -সে পথের নির্দেশনাও এসেছে পবিত্র কুর’আনে। যে ব্যক্তি ব্যর্থ হয় সে সম্পর্ক গড়তে, তাঁর পুরা বাঁচাটিই ব্যর্থ হয়ে যায়। তারাই অনুসারী হয় শয়তানের। তাদের সে পথটি জাহান্নামের। মহান আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত করার তাগিদ দিয়ে নিচের আয়াতে নির্দেশ এসেছে: 

فَٱسْتَمْسِكْ بِٱلَّذِىٓ أُوحِىَ إِلَيْكَ ۖ إِنَّكَ عَلَىٰ صِرَٰطٍۢ مُّسْتَقِيمٍۢ

অর্থ: “যা কিছু আপনার উপর নাযিল করা হয়েছে (কুর’আনকে) সেগুলিকে আঁকড়ে ধরুন, নিশ্চয়ই আপনি সিরাতাল মুস্তকীমের উপর আছেন।” –(সুরা যুখরুফ, আয়াত ৪৩)।

উপরের আয়াতে নবীজী (সা:)’য়ের উপর হুকুম এসেছে, যা কিছু তাঁর উপর কুর’আনে নাযিল হয়েছে -সেগুলি আঁকড়ে ধরার। হুকুম এখানে পবিত্র কুর’আন অনুসরণের। কুর’আন অনুসরণের অর্থ সিরাতাল মুস্তাকীমের অনুসরণ। এবং যে ব্যক্তি সিরাতাল মুস্তাকীমে চলে, একমাত্র সেই পায় জান্নাত। বুঝতে হবে, যে হুকুম নবীজী (সা:)’য়ের উপর, সে হুকুম তাঁর উম্মতের উপরও। কিরূপে সিরাতাল মুস্তাকীম জুটে -সে বর্ণনা এসেছে নিচের আয়াতে:

وَمَن يَعْتَصِم بِٱللَّهِ فَقَدْ هُدِىَ إِلَىٰ صِرَٰطٍۢ مُّسْتَقِيمٍۢ

অর্থ‍: “এবং যারা আল্লাহর সাথে একাত্ম হলো, সেই পেল সিরাতাল মুস্তাকীমের পথে হিদায়েত।”-(সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১০১)।

উপরের আয়াতে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি একাত্ম হয় মহান আল্লাহর সাথে, সে পায় সিরাতাল মুস্তাকীম। আল্লাহ তায়ালার সাথে একাত্ম হওয়ার অর্থ, পবিত্র কুর’আনে ঘোষিত তাঁর এজেন্ডার সাথে একাত্ম হওয়া। এবং যে ব্যক্তি সে এজেন্ডার  সাথে একাত্ম হয়, একমাত্র সেই পায় হিদায়েত। একমাত্র এ পথেই মু’মিন ব্যক্তি নিজের জন্য যেমন সিরাতাল মুস্তিকীমখুঁজে পায়, তেমনি সিরাতাল মুস্তিকীমের সন্ধান দেয় লক্ষ লক্ষ মানুষকে। মু’মিনের কাজ হলো জনগণের সামনে পবিত্র কুর’আনের দর্শন এবং এজেন্ডাকে পেশ করা। একাজই করে গেছেন মহান নবীজী (সা:)। আল্লাহ তায়ালার খলিফা ও নবীজী (সা:)’য়ের উম্মত রূপে এ কাজ তো প্রতিটি মুসলিমের। যে ব্যক্তি কুর’আন পড়লো না এবং পড়লেও বুঝলো না সে মহান রব’য়ের কুর’আনী এজেন্ডার সাথে একাত্ম হবে কিরূপে?  

পবিত্র কুর’আন মহান রব’য়ের যে এজেন্ডার কথা বলে, নবীজী (সা:)’য়ের নবুয়তী ২৩টি বছর কেটেছে সে এজেন্ডাকে বিজয়ী করার জিহাদ নিয়ে। তাঁর সে জিহাদে ছিল দাওয়াতী কাজ, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জিহাদ, ৮৩টি সশস্ত্র যুদ্ধ এবং ১০টি বছরের রাষ্ট্র প্রধানের দায়িত্ব পালন। যারা নবীজী (সা:)’‌য়ের উম্মত হওয়ার দাবী করে তাদের উপর ফরজ হলো তারা বাঁচবে সে এজেন্ডাকে বিজয়ী করার জিহাদ নিয়ে। সে এজেন্ডার সাথে তো তারাই একাত্ম তে পারে যারা কুর’আন বুঝে। অথচ এখানেই আজকের মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। কুর’আন বুঝা এবং কুর’আনের এজেন্ডার সাথে একাত্ম হওয়ার বদলে তারা গড়েছে কুর’আনে সাথে গভীর বিচ্ছিন্নতা। এবং পবিত্র কুর’আন না বুঝার কারণে সে বিচ্ছিন্নতা দিন দিন আরো গভীরতর হয়েছে। এরই পরিণাম হলো, আজ মহান আল্লাহ তায়ালার এজেন্ডাই তাদের কাছে অপরিচিত। তারা বাঁচছে জাতীয়তাবাদী, বর্ণবাদী, ফ্যাসিবাদী, রাজতন্ত্রী, দলবাদী ইত্যাদি মতবাদী রাজনীতির এজেন্ডা নিয়ে।   

পথটি বিদ্রোহ, বেঈমানী ও  বিভক্তির

নবীজী (সা:) এবং তাঁর সাহাবাগণ ইসলামী রাষ্ট্র ও সভ্যতা নির্মাণের কাজটি শুরু করেছিলেন পবিত্র কুর’আনের শিক্ষাকে হৃদয়ে ধারণ করার মধ্য দিয়ে।  অথচ আজকের ইসলামপন্থী নেতাকর্মী তাদের কাজের শুরু করেছে শুরুর এ ধাপটি বাদ দিয়েই। তারা ফাউন্ডেশন না গড়েই প্রাসাদ গড়ার স্বপ্ন দেখছে! ফলে আজকের মুসলিমদের ইসলামী রাষ্ট্র গড়ার সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হচ্ছে। অপরদিকে যাদের অটুট সম্পর্ক মহান আল্লাহ তায়ালার সাথে, তাদের তাড়না থাকে মহান রব’য়ের এজেন্ডাকে বিজয়ী করার। সে কাজটি একাকী অসম্ভব; ফলে অপরিহার্য হলো একতা। এজন্যই মহান রব শুধু নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাত ফরজ করেননি, ফরজ করেছেন একতা। যারা বিভক্ত হলো, তাদেরকে শোনানো হয়েছে ভয়ানক আযাবের প্রতিশ্রুতি। সে ঘোষাণাটি এসেছে সুরা আল ইমরানে ১০৫ নম্বর আয়াতে। তাই একটি দেশে কতটা ইসলাম পালন হয়, সেটি বুঝা যায় মুসলিমদের মাঝে একতা দেখে। অপর দিকে বিবাদ ও বিভক্তির মাঝে প্রকাশ পায় বেঈমানী। নিচের আয়াতাংশে সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ তায়ালা দুটি গুরুত্বপূর্ণ হুকুম একত্রে দিয়েছেন। একটি একতার পক্ষে, অপরটি বিভক্তির বিরুদ্ধে। সে নির্দেশটি এসেছে এভাবে:

وَٱعْتَصِمُوا۟ بِحَبْلِ ٱللَّهِ جَمِيعًۭا وَلَا تَفَرَّقُوا۟ ۚ

অর্থ: “এবং তোমরা আল্লাহর রশিকে শক্তভাবে ধরো এবং পরস্পরে বিভক্ত হয়ো না।” -সুরা আল ইমরান ১০৩।

মুসলিম হওয়ার ঈমানী দায় হলো, তাকে বাঁচতে হয় মহান রব’য়ের প্রতিটি হুকুমের প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ নিয়ে। যে কোন হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহই হলো বেঈমানী। অথচ মুসলিমগণ ইতিহাস গড়েছে বিভক্তিতে। এভাবে দৃশমান করেছে নিজেদের বেঈমানীকে। একতায় তাদের আগ্রহ নাই, বরং তীব্র আসক্তি বিভক্তিতে। সেটি বেঈমানী বুঝা যায় ৫০টি বেশি টুকরোয় মুসলিম উম্মাহর বিভক্তি দেখে। ভাঙা নিয়েই তাদের বিশাল উৎসব; গড়া নিয়ে নয়। তাই আরবরা খেলাফত ভেঙে এবং ২২ টুকরোয় বিভক্ত হয়ে উৎসব করে। আর বাঙালি মুসলিমরা উৎসব করে পাকিস্তান ভেঙে। এরূপ বিভক্তির উৎসব তো শয়তান ও তার অনুসারীদের খুশি করার পথ।  এরূপ বিদ্রোহী ও বেঈমানদের নামাজ রোজা ও হজ্জ যাকাতের কি আদৌ কোন মূল্য আছে?    

উপরের আয়াতটিতে সুস্পষ্ট নির্দেশ এসেছে একতার। এবং একতার ভিত্তি কি হবে আয়াতটিতে সেটিও সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। সেটি ভাষা, বর্ণ, গোত্র, আঞ্চলিকতা বা মতবাদী রাজনীতির ভিত্তিতে হবে না; বরং হবে কুর’আনের ভিত্তিতে। অর্থাৎ গুরুত্ব পাবে একমাত্র কুর’আনী এজেন্ডা। পরিতাপের বিষয় হলো, মহান আল্লাহ তায়ালার উপরিউক্ত হুকুম স্রেফ কিতাবেই রয়ে গেছে; তা আদৌ মুসলিমদের হৃদয়ে স্থান পায়নি। অথচ প্রাথমিক যুগের মুসলিমগণ তাদের ভাষা, গোত্র, বর্ণ ও ভূগোল ভিত্তিক বিভক্তিকে কবর দিয়েছিল। আরব, ইরানী, তুর্কি, কুর্দি, হাবশি, মুর ইত্যাদি নানা পরিচয়ের মানুষ সেদিন একতাবদ্ধ হয়েছিল। মহান আল্লাহর হুকুমকে এভাবেই তারা মান্যতা ও ইজ্জত দিয়েছিল। ফলে তারাও পেয়েছিল মহান রব’য়ের অপরিমেয় সাহায্য। সে সাহায্যের বরকতে তারা নিজেরাও বিজয়ের পর বিজয় ও ইজ্জত পেয়েছিল এবং পরিণত হয়েছিল বিশ্বশক্তিতে। অথচ আজকের মুসলিমরা সে পথে নাই। তারা ধরেছে বিদ্রোহ, বেঈমানী ও বিভক্তির পথ। ০৭/০৮/২০২৬          

Please follow and like us:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top