loader image
শিরোনাম

বার্ষিক কোটার বাইরে বিদেশে ট্যুর প্যাকেজে অতিরিক্ত তিন হাজার ডলার খরচের সুযোগ

বার্ষিক ভ্রমণ কোটার বাইরে সুবিধা পাবেন টিওএবি সদস্য ট্যুর অপারেটরদের মাধ্যমে ভ্রমণকারীরা, তবে থাকছে কঠোর নথিপত্র যাচাই, পাসপোর্টভিত্তিক হিসাব ও বাংলাদেশ ব্যাংকে বাধ্যতামূলক প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা বজায় রেখে বিদেশগামী পর্যটন খাতের সুশৃঙ্খল বিকাশ নিশ্চিত করতে নতুন সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে দেশে বৈধভাবে পরিচালিত এবং ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সদস্য ট্যুর অপারেটরদের মাধ্যমে আয়োজিত বিদেশ ভ্রমণ প্যাকেজের বিপরীতে নির্দিষ্ট শর্তে বিদেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানো যাবে। এ ক্ষেত্রে একজন ভ্রমণকারীর জন্য প্রতি বছরে সর্বোচ্চ ৩ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানো যাবে, যা প্রচলিত বার্ষিক ভ্রমণ কোটার বাইরে প্রযোজ্য হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ-১ থেকে ৭ মে ২০২৬ তারিখে জারি করা বৈদেশিক মুদ্রা সংক্রান্ত পরিপত্রের বিদেশ ভ্রমণ প্যাকেজ বিষয়ক অংশের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক মো. হারুন-অর-রশিদ স্বাক্ষরিত পরিপত্রে বিদেশ ভ্রমণ প্যাকেজের অর্থ পরিশোধ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ভ্রমণকারীর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সীমা, ব্যাংকের যাচাই-বাছাই এবং পরবর্তী নজরদারির বিষয়ে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নতুন ব্যবস্থার আওতায় শুধু ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সদস্য ট্যুর অপারেটররাই এ সুবিধা নিতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট ট্যুর অপারেটরের বিদেশি ট্যুর অপারেটর, হোটেল অথবা গন্তব্য ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কার্যকর ব্যবসায়িক সমঝোতা বা চুক্তি থাকতে হবে। এর ফলে অনিবন্ধিত কিংবা নির্ধারিত সংগঠনের সদস্য নয়—এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই সুবিধায় বিদেশে অর্থ পাঠানোর সুযোগ থাকবে না।

নির্দেশনা অনুযায়ী, যোগ্য ট্যুর অপারেটররা বিদেশ ভ্রমণের বিভিন্ন সেবার জন্য বাংলাদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্যাকেজের মূল্য গ্রহণ করতে পারবেন। এসব সেবার মধ্যে বিদেশে থাকার ব্যবস্থা, যাতায়াত এবং গন্তব্যস্থলের অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পর্যটনসেবা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারবে। গ্রাহকের কাছ থেকে বাংলাদেশি মুদ্রায় অর্থ নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বিদেশি ট্যুর অপারেটর, হোটেল অথবা গন্তব্য ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে প্রচলিত বিনিময় হারে বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থ পাঠাতে পারবে অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী ব্যাংক।
তবে কোনো প্যাকেজের বিপরীতে বিদেশে অর্থ পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে লেনদেনের প্রকৃততা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য বিদেশি সেবা প্রদানকারীর দেওয়া চালান বা চুক্তিপত্র, বিস্তারিত ভ্রমণসূচি ও ব্যয়ের হিসাব, ভ্রমণকারীদের নাম ও পাসপোর্ট নম্বরসংবলিত তালিকা, স্থানীয় ট্যুর অপারেটর ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার চুক্তি এবং গ্রাহকের কাছ থেকে বাংলাদেশি মুদ্রায় অর্থ গ্রহণের প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে। অর্থাৎ শুধু বিদেশে ভ্রমণের পরিকল্পনা বা সাধারণ বুকিংয়ের ভিত্তিতে অর্থ পাঠানো যাবে না; প্যাকেজের প্রকৃত অস্তিত্ব এবং সংশ্লিষ্ট অর্থ লেনদেনের যথাযথ প্রমাণ থাকতে হবে।
নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, একজন ভ্রমণকারীর জন্য প্রতি পঞ্জিকা বছরে সর্বোচ্চ ৩ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত বিদেশ ভ্রমণ প্যাকেজের বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠানো যাবে। এই অর্থ প্রচলিত বার্ষিক ভ্রমণ কোটার অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে একজন ভ্রমণকারী একাধিক ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে একই সুবিধা নিয়ে নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করতে পারবেন না।

এ কারণে ট্যুর অপারেটরদের প্রতিটি লেনদেন সংশ্লিষ্ট ভ্রমণকারীর পাসপোর্ট নম্বরের বিপরীতে সংরক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে একটি পঞ্জিকা বছরে ওই ভ্রমণকারীর নামে মোট কত বৈদেশিক মুদ্রা ছাড় করা হয়েছে, তার ধারাবাহিক হিসাব রাখতে হবে। একাধিকবার বা একাধিক ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে লেনদেন হলেও সব মিলিয়ে নির্ধারিত সীমার মধ্যে অর্থ পাঠানো হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্বও ট্যুর অপারেটরের ওপর থাকবে।
ভ্রমণকারীর কাছ থেকেও এ বিষয়ে লিখিত ঘোষণা নিতে হবে। ওই ঘোষণায় ভ্রমণকারীকে নিশ্চিত করতে হবে যে অন্য কোনো ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে একই বছরে নির্ধারিত বৈদেশিক মুদ্রার সীমা অতিক্রম করে অর্থ নেওয়া হয়নি। ফলে একই ব্যক্তি যাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একই সুবিধা একাধিকবার গ্রহণ করতে না পারেন, সে বিষয়ে একটি সমন্বিত নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশে বৈধ অনুমতি নিয়ে বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের কাছে বিক্রি করা বিদেশ ভ্রমণ প্যাকেজের ক্ষেত্রে এই ৩ হাজার মার্কিন ডলারের সুবিধা প্রযোজ্য হবে না। এ ধরনের বিদেশি নাগরিকের কাছে প্যাকেজ বিক্রি হলে আন্তর্জাতিক কার্ডের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে অনুমোদিত ব্যাংকগুলোকে কার্ডের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণের প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।

তবে নির্ধারিত ৩ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি মূল্যের প্যাকেজের ক্ষেত্রেও বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সীমার অতিরিক্ত অর্থের ক্ষেত্রে তা আন্তর্জাতিক কার্ডের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় গ্রহণ করতে হবে। এ ধরনের লেনদেনে অনুমোদিত ব্যাংক কার্ডের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণের ব্যবস্থা করতে পারবে এবং সংশ্লিষ্ট অর্থ নির্ধারিত মার্জিন হিসাবে সংরক্ষণ করতে পারবে।

ট্যুর অপারেটরদের পাশাপাশি অনুমোদিত ব্যাংকগুলোর ওপরও যথেষ্ট দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে স্থানীয় ট্যুর অপারেটর এবং বিদেশি অংশীদার প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। লেনদেনটি ট্যুর অপারেটরের ঘোষিত ব্যবসার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ হিসাব ও নথি সংরক্ষণ করতে হবে এবং অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে অর্থ পাঠানো, মূলধন পাচার কিংবা এই সুবিধার অপব্যবহার হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

ট্যুর অপারেটররা তাদের সেবামূল্য বা কমিশন বাংলাদেশি মুদ্রায় রাখতে পারবেন। বিদেশে যে অর্থ পাঠানো হবে, তাতে স্থানীয় ট্যুর অপারেটরের কমিশন এবং প্রযোজ্য কর বাদ দেওয়ার পর বিদেশি পক্ষকে প্রকৃতপক্ষে যে নিট অর্থ পরিশোধ করতে হবে, শুধু সেই অর্থই অন্তর্ভুক্ত থাকবে। অর্থাৎ অতিরিক্ত কমিশন বা অন্য কোনো খাত দেখিয়ে বিদেশে বাড়তি অর্থ পাঠানোর সুযোগ রাখা হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, এই সুবিধা প্রকৃত ভ্রমণসেবার বাইরে কোনো অর্থ স্থানান্তরের কাজে ব্যবহার করা যাবে না। নিশ্চিত বুকিং বা চুক্তিগত দায়বদ্ধতা ছাড়া অগ্রিম অর্থ পাঠানো যাবে না। একইভাবে ভ্রমণ ব্যয়ের আড়ালে মূলধনী হিসাবের লেনদেন পরিচালনা কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে বৈদেশিক মুদ্রা স্থানান্তরও নিষিদ্ধ থাকবে।
বিদেশে অর্থ পাঠানোর আগে অনুমোদিত ব্যাংককে সংশ্লিষ্ট আবেদন, বিবরণী ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে লেনদেনের প্রকৃততা নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের মার্জিন হিসাবে বৈদেশিক মুদ্রা থাকলে প্রথমে সেই অর্থ ব্যবহার করতে হবে। এরপর প্রয়োজন হলে অবশিষ্ট অর্থ বাংলাদেশি মুদ্রার হিসাব থেকে সংগ্রহ করে বিদেশে পাঠাতে হবে।
এদিকে প্রতিটি রেমিট্যান্স বা বিদেশে অর্থ পাঠানোর পরও ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব শেষ হবে না। অর্থ পাঠানোর সাত দিনের মধ্যে নিয়মিত প্রতিবেদনের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা কার্যক্রম বিভাগ-২ অথবা সংশ্লিষ্ট এলাকার কার্যালয়ে নির্ধারিত পরিশিষ্ট অনুযায়ী বিস্তারিত বিবরণ পাঠাতে হবে। এসব তথ্য পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক যাচাই ও পর্যালোচনার কাজে ব্যবহার করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশ ভ্রমণ প্যাকেজের বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রা পরিশোধের একটি আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালু হওয়ায় বৈধ ট্যুর অপারেটরদের ব্যবসা পরিচালনা সহজ হওয়ার পাশাপাশি বিদেশে ভ্রমণসেবার মূল্য পরিশোধে স্বচ্ছতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পাসপোর্ট নম্বরের ভিত্তিতে হিসাব সংরক্ষণ এবং একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একই ব্যক্তির নামে অর্থ ছাড়ের তথ্য পর্যবেক্ষণের ফলে নির্ধারিত সীমার অপব্যবহারের সুযোগ কমবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তে একদিকে বিদেশগামী পর্যটন খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার অপচয়, অতিরিক্ত অর্থ স্থানান্তর, অর্থ পাচার এবং ভুয়া ভ্রমণ প্যাকেজের মাধ্যমে অর্থ বিদেশে নেওয়ার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্তের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদেশ ভ্রমণ প্যাকেজ সংক্রান্ত ২০২৬ সালের সংশ্লিষ্ট পরিপত্রের পূর্ববর্তী নির্দেশনাগুলো সংশোধিত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে নতুন নির্দেশনার বিষয়বস্তু তাদের সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের অবহিত করার নির্দেশ দিয়েছে। ফলে এখন থেকে বিদেশ ভ্রমণ প্যাকেজের বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাতে হলে ট্যুর অপারেটর, ভ্রমণকারী এবং ব্যাংক—তিন পক্ষকেই নির্ধারিত নিয়ম, নথিপত্র ও সীমা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।

Please follow and like us:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top