loader image
শিরোনাম

সিমপাইসা-আমারপে’র ডিজিটাল মানিলন্ডারিং

সংশ্লিষ্ট ৭ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে বিএফআইইউ

জুয়া ও পর্নোগ্রাফি সাইটে পেমেন্ট নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ, ‘নেটিং’ পদ্ধতিতে অর্থ নিষ্পত্তি নিয়ে প্রশ্ন

আল মুজাদ্দেদী

সিমপাইসা হোল্ডিংস পিটিই লিমিটেডের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর বাংলাদেশের পেমেন্ট গেটওয়ে প্রতিষ্ঠান ‘আমার পে’ নিয়ে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। জুয়া ও পর্নোগ্রাফি-সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে পেমেন্ট নেওয়ার চেষ্টা, সন্দেহজনক লেনদেন, স্থানীয় ও বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন ‘নেটিং’ পদ্ধতিতে সমন্বয় এবং রেমিট্যান্সের অর্থ নিষ্পত্তি নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগ এখন বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) নজরদারিতে এসেছে।
অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সিমপাইসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দিয়েছে বিএফআইইউ। সম্প্রতি ব্যাংকগুলোর কাছে পাঠানো নির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট হিসাবগুলোর লেনদেন স্থগিত করার পাশাপাশি এসব হিসাবের বিস্তারিত তথ্য ও নথিপত্র বিএফআইইউতে পাঠাতে বলা হয়েছে।
যাদের ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তারা হলেন, সফট টেক ইনোভেশন লিমিটেড, সিমপাইসা হোল্ডিংস পিটিই লিমিটেড, আমারপে’র প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএম ইশতিয়াক সারওয়ার, সিমপাইসার গ্লোবাল সিইও ইয়াসির পাশা (সিঙ্গাপুর), কামিল কামরান শেখ (দুবাই), এডভোকেট এম মহিউদ্দিন সারওয়ার এবং সিমপাইসার স্থানীয় প্রতিনিধি সানজানা ফরিদ। সিমপাইসা হোল্ডিংস পিটিই লিমিটেড সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান।

বিএফআইইউর নির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব খোলার ফরম, টিপি, গ্রাহক পরিচিতি-সংক্রান্ত নথি এবং হালনাগাদ হিসাব বিবরণী চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পাঁচ লাখ টাকা বা তার বেশি অঙ্কের সব লেনদেনের ভাউচার, সিমপাইসা হোল্ডিংস পিটিই লিমিটেডের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের তথ্য, চুক্তিপত্র, লেনদেনের উদ্দেশ্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক দলিল পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সিমপাইসা আমার পের ৭৫ দশমিক ২৮৪ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণ করে। এর আগে আমার পের ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ শেয়ার ১০ লাখ মার্কিন ডলারে কেনার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল। পরে ৮ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলারে ৭৫ দশমিক ২৮৪ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণ করা হয় এবং এ অধিগ্রহণে বাংলাদেশ ব্যাংক অনাপত্তি দেয়।

মালিকানা পরিবর্তনের পর আমার পের মাধ্যমে বিদেশি বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের অর্থ পরিশোধের কার্যক্রম শুরু হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে সিমপাইসার নির্দেশনায় জুয়া ও পর্নোগ্রাফি-সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটের পেমেন্ট নেওয়ার জন্য মার্চেন্ট যুক্ত করার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ ওঠে। ‘পে লোকো’ ও ‘কোয়ার টেক’ নামের প্ল্যাটফর্মের জন্য পেমেন্ট সেবা চালুর চেষ্টা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

এসব অভিযোগের মধ্যে মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ ও নগদ আমার পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি মার্চেন্ট হিসাব স্থগিত করে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সন্দেহজনক লেনদেন এবং নিয়ন্ত্রক নির্দেশনার বাইরে মার্চেন্ট যুক্ত করার চেষ্টার অভিযোগে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট মার্চেন্টগুলোর মধ্যে ওমাজা, ওকে পে, কোডা পেমেন্টস, ইউ সলভ পে, ভি৩৮০ প্রো, ক্লিপস পে, নিউ লাইট এবং অনলাইন বেটের নামও এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের সঙ্গে জুয়া ও পর্নোগ্রাফি-সংশ্লিষ্ট লেনদেনের যোগসূত্রের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ তদন্তের আগে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

এ ছাড়া অনুসন্ধানে ‘পেকাজমা’ নামের একটি আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সেবা প্রতিষ্ঠানের প্ল্যাটফর্মে আমার পের লোগো পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। ওই প্ল্যাটফর্ম বিভিন্ন জুয়া, পর্নোগ্রাফি ও প্রাপ্তবয়স্কদের ওয়েবসাইটের জন্য পেমেন্ট সেবা দিয়ে থাকে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে পেকাজমার সঙ্গে আমার পের ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

আমার পের কার্যক্রমে সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ এরই মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তেও এসেছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার আর্থিক অপরাধ তদন্ত ইউনিট বিষয়টি তদন্ত করছে। তদন্তের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট মার্চেন্টের তথ্য, নথিপত্র, লেনদেনের রেকর্ড এবং অর্থ নিষ্পত্তির তথ্য চাওয়া হয়েছে।

তবে সিমপাইসা ও আমার পে-কে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে স্থানীয় মুদ্রা ও বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন ‘নেটিং’ পদ্ধতিতে সমন্বয় নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, বাংলাদেশি গ্রাহকদের কাছ থেকে বিদেশি সেবার মূল্য হিসেবে সংগৃহীত টাকা সরাসরি বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে বিদেশে পাঠানোর পরিবর্তে বাংলাদেশেই থেকে যায়। অন্যদিকে বিদেশে থাকা সিমপাইসার তহবিল ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পাওনা পরিশোধ করা হয়।

একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে থাকা প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের বিপরীতে বাংলাদেশে স্থানীয় মুদ্রায় অর্থ পরিশোধ করা হয়। অর্থাৎ বিদেশ থেকে আসা বৈদেশিক মুদ্রা দেশে না এনে বিদেশেই রেখে দেওয়া হয় এবং বাংলাদেশে থাকা টাকা ব্যবহার করে স্থানীয় সুবিধাভোগীদের অর্থ দেওয়া হয়। এভাবে স্থানীয় ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহকে আলাদাভাবে নিষ্পত্তি না করে পরস্পরের সঙ্গে সমন্বয় করার অভিযোগ উঠেছে।

এ ধরনের ব্যবস্থাকে আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা হুন্ডির মতো কাঠামোর সঙ্গে তুলনা করেছেন। ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞ ফারুক মঈনউদ্দীন বলেছেন, অভিযোগিত পদ্ধতি সত্য হলে এটি ‘ডিজিটাল মানি লন্ডারিং’-এর একটি রূপ হতে পারে। তাঁর মতে, অর্থ দেশে থেকে যাওয়া এবং এর বিপরীতে সংশ্লিষ্ট বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে অবস্থান করার ব্যবস্থা বৈধ তহবিল স্থানান্তরের মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, আমারপে বিদেশি মার্চেন্টদের কাছ থেকে স্থানীয় মুদ্রায় অর্থ সংগ্রহের অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আবেদন করেছে এবং আবেদনটি বর্তমানে পর্যালোচনাধীন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আমার পে এ ধরনের লেনদেনে বাংলাদেশি মুদ্রায় অর্থ সংগ্রহের বিপরীতে কমিশন পাওয়ার অধিকারী হবে এবং সিমপাইসা বাংলাদেশ বিদেশি মার্চেন্টদের স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করবে। একইসঙ্গে ‘নেটিং’ একটি প্রচলিত অর্থ নিষ্পত্তি পদ্ধতি হলেও প্রস্তাবিত নেটিং ব্যবস্থায় কোনো ঝুঁকি রয়েছে কি না, তা বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস সুপারভিশন বিভাগ ও বিএফআইইউ নিয়মিত পরিদর্শনের সময় মূল্যায়ন করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্সের বৈদেশিক মুদ্রা অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকের বিদেশি নস্ট্রো হিসাবে জমা হওয়ার কথা। রেমিট্যান্স সংগ্রহ বা বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান নিজেরা নস্ট্রো হিসাব পরিচালনা করতে পারে না। কিন্তু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, আমার পে অর্থাৎ সিমপাইসার কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো নস্ট্রো হিসাব পাওয়া যায়নি। বরং একটি ব্যাংকের হিসাবে অন্য একটি তফসিলি ব্যাংক থেকে অর্থ স্থানান্তরের পর আমার পে বা সিমপাইসার নির্দেশনা অনুযায়ী সুবিধাভোগীদের মধ্যে অর্থ বিতরণ করা হয়েছে বলে ব্যাংকটির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র আরও জানিয়েছে, বাংলাদেশে বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত অর্থকে রেমিট্যান্সের সঙ্গে ‘নেট’ বা সমন্বয় করার কোনো আইনগত বিধান নেই। এ ধরনের কার্যক্রম বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘন করতে পারে এবং অর্থ পাচারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠান এ ধরনের কার্যক্রমে জড়িত পাওয়া গেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

বিদেশি প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশি গ্রাহকদের পেমেন্ট গ্রহণের পরিমাণ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্পটিফাই ও পিইউবিজির মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মের জন্য আমার পের মাধ্যমে মাসে গড়ে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার লেনদেন হতো। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব অর্থ সরাসরি বিদেশে পাঠানোর পরিবর্তে দেশে থাকা তহবিলের সঙ্গে বিদেশে থাকা সিমপাইসার তহবিল সমন্বয় করে সংশ্লিষ্ট বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পাওনা পরিশোধ করা হতো।
এদিকে আমার পের মাধ্যমে স্পটিফাইয়ের সাবস্ক্রিপশনের মূল্য পরিশোধ করা কয়েকজন গ্রাহক সেবা না পাওয়ার অভিযোগও করেছেন। অর্থ পরিশোধের পরও সাবস্ক্রিপশন সক্রিয় না হওয়া এবং সমস্যা সমাধানে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আমার পে সরাসরি স্পটিফাইকে অর্থ পরিশোধ না করায় গ্রাহকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হয়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে অবশ্য সিমপাইসা ও আমার পের পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের ইমেইলে প্রশ্ন পাঠানো হলেও সিমপাইসার গ্লোবাল সিইও ইয়াসির পাশা কোনো জবাব দেননি। পরে সিমপাইসার বাংলাদেশ প্রতিনিধি ও আমার পের প্রধান নির্বাহী সানজানা ফরিদের সঙ্গে ফোনে কথা হলে তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন।
এখন বিএফআইইউর ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশের ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক কার্যক্রম আরও গভীরভাবে যাচাইয়ের আওতায় এসেছে। বিশেষ করে পাঁচ লাখ টাকা বা তার বেশি অঙ্কের লেনদেনের ভাউচার, হিসাব খোলার নথি, গ্রাহক পরিচিতি-সংক্রান্ত তথ্য, ব্যবসায়িক চুক্তি এবং সিমপাইসা হোল্ডিংস পিটিই লিমিটেডের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্কের দলিল পর্যালোচনার মাধ্যমে অর্থের উৎস, গন্তব্য ও লেনদেনের প্রকৃতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

Please follow and like us:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top