ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের বিস্তারে বদলে যাচ্ছে দেশের লেনদেনের ধরন, এক মাসেই বিদেশে কার্ডের মাধ্যমে এক হাজার ৩৭ কোটি টাকার লেনদেন
নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনে ব্যাংক কার্ডের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। নগদ টাকার পরিবর্তে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের মাধ্যমে কেনাকাটা, সেবা গ্রহণ, অর্থ উত্তোলন এবং দেশের বাইরে বিভিন্ন ধরনের ব্যয়ের প্রবণতা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, গত পাঁচ বছরে দেশে এসব কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৯৭ শতাংশ। একই সময়ে কার্ডের মাধ্যমে মোট লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে ৯১ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, কার্ডভিত্তিক লেনদেনের এই দ্রুত সম্প্রসারণ দেশের ভোক্তা আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়ার পাশাপাশি ডিজিটাল ও নগদবিহীন লেনদেনের প্রতি আগ্রহও বাড়ছে। বিশেষ করে কেনাকাটা, পরিবহন, বিভিন্ন সেবা গ্রহণ এবং অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রে কার্ড এখন অনেকের নিয়মিত আর্থিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরের ব্যবধানে দেশে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ লেনদেন বেড়েছে ৪৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। অর্থাৎ সামগ্রিক কার্ড ব্যবহারের প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ডের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারেও শক্তিশালী গতি তৈরি হয়েছে। এর বিপরীতে একই সময়ে দেশের বাইরে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৫৫ শতাংশ। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ ভোগ ও কেনাকাটায় ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বিদেশে ব্যবহারের তুলনায় অনেক বেশি গতিশীল হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের কার্ডের মাধ্যমে ব্যয়ের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশে কার্ডের মাধ্যমে ব্যয় বেড়েছে ২৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এতে দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও সেবা খাতে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের বিস্তারের পাশাপাশি বিদেশি ব্যবহারকারীদের মধ্যেও এ ধরনের লেনদেনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অংশ দখল করে আছে বিপণিবিতান ও বড় খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র। ২০২৬ সালের জুনে দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে হওয়া মোট লেনদেনের প্রায় অর্ধেকই হয়েছে বিপণিবিতানে। এতে ভোক্তাদের কেনাকাটায় কার্ডনির্ভরতা বাড়ার পাশাপাশি দেশের খুচরা বাজারেও নগদবিহীন লেনদেনের বিস্তার সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।
বিদেশে বাংলাদেশি কার্ডধারীদের ব্যয়ের চিত্রও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২৬ সালের জুনে দেশের বাইরে ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ডের মাধ্যমে মোট ১০ হাজার ৩৭০ কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। এর বিপরীতে একই সময়ে বিদেশি নাগরিকদের কার্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করা অর্থের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৪২০ কোটি টাকা। অর্থাৎ কার্ডের মাধ্যমে দেশের বাইরে অর্থপ্রবাহ এবং দেশের ভেতরে বিদেশিদের ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে।
ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে জুন মাসে বিদেশে লেনদেন হয়েছে ৫ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। মোট লেনদেনের সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ৬৩ হাজার ৪১২টি। এর মধ্যে বিপণিবাণিজ্যকেন্দ্রিক ব্যয় ছিল মোট লেনদেনের ৩৩ দশমিক ১০ শতাংশ। খুচরা বিক্রয়সংক্রান্ত সেবায় ব্যয় হয়েছে আরও ১৭ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ এই দুই খাত মিলিয়েই বিদেশে ক্রেডিট কার্ডের প্রায় অর্ধেক ব্যয় হয়েছে। এতে বোঝা যায়, বিদেশ ভ্রমণের সময় কেনাকাটা ও খুচরা সেবা গ্রহণে বাংলাদেশি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীদের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি।
ডেবিট কার্ডের ক্ষেত্রেও বিদেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে। জুন মাসে ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে বিদেশে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ২৩২ কোটি টাকা এবং লেনদেনের সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ১৫ হাজার ৭১৯টি। এর মধ্যে সরকারি সেবা গ্রহণে ব্যয় হয়েছে ২২ দশমিক ১৯ শতাংশ, বিপণিবাণিজ্যকেন্দ্রে ২০ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং ব্যবসায়িক সেবায় ১২ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এই তিন খাতেই ডেবিট কার্ডের বিদেশি লেনদেনের অর্ধেকের বেশি সম্পন্ন হয়েছে।
প্রিপেইড কার্ডের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম হলেও এ ক্ষেত্রেও বিদেশে উল্লেখযোগ্য লেনদেন হয়েছে। জুন মাসে প্রিপেইড কার্ডের মাধ্যমে বিদেশে ব্যয় হয়েছে ৬১১ কোটি টাকা। মোট লেনদেনের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২২ হাজার ২৫টি। এর মধ্যে সরকারি সেবায় ২৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ, নগদ অর্থ উত্তোলনে ১৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং বিপণিবাণিজ্যকেন্দ্রে ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। এই তিন খাত মিলে প্রিপেইড কার্ডের বিদেশি ব্যয়ের অর্ধেকের বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে তিন ধরনের কার্ড মিলিয়ে দেশের বাইরে মোট অর্থপ্রবাহ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। মার্কিন মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৮ কোটি ৪৪ লাখ ৮০ হাজার ডলার। একই সময়ে দেশের বাইরে থেকে কার্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশে এসেছে ২ হাজার ৪২০ কোটি টাকা বা প্রায় ১ কোটি ৯৬ লাখ ৭০ হাজার ডলার। ফলে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের মাধ্যমে বিদেশে অর্থপ্রবাহ দেশের ভেতরে বিদেশিদের ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ৪ দশমিক ২৯ গুণ বেশি।
ব্যাংকিং খাতের ব্যবস্থাপনা পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা মনে করেন, কার্ড ব্যবহারের এই দ্রুত প্রবৃদ্ধি দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাঁর মতে, মানুষ এখন নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি কমিয়ে সরাসরি ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে যুক্ত কার্ড ব্যবহার করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে। একই সঙ্গে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও কার্ড গ্রহণের সুযোগ বাড়ায় এই প্রবণতা আরও শক্তিশালী হচ্ছে। তবে কার্ডের ব্যবহার যত বাড়বে, নিরাপত্তা, গ্রাহক সুরক্ষা এবং লেনদেন পর্যবেক্ষণের সক্ষমতাও একই সঙ্গে বাড়াতে হবে।
সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাশরুর আরেফিন বলেন, দেশে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের প্রবৃদ্ধি শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফল নয়; এটি মানুষের ভোগের ধরন এবং আর্থিক আচরণেও পরিবর্তনের প্রতিফলন। বিশেষ করে ক্রেডিট কার্ডের অভ্যন্তরীণ ব্যবহারে ৪৩ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ভোক্তা ব্যয়ের শক্তিশালী চাহিদার ইঙ্গিত দেয়। তবে বিদেশে কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপের বিষয়টিও নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় রাখতে হবে। তাঁর মতে, একই সঙ্গে দেশে কার্ডভিত্তিক লেনদেনের অবকাঠামো আরও বিস্তৃত করা গেলে নগদনির্ভরতা কমবে এবং অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক লেনদেনের পরিধি বাড়বে।
এদিকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৪৮টি তফসিলি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে মোট ৩৯ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে গ্রাহকদের কাছে বকেয়া বা পাওনা হিসেবে রয়েছে ১৩ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ক্রেডিট কার্ডভিত্তিক ঋণের বাজারও দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় একটি উল্লেখযোগ্য আকার ধারণ করেছে।
সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যালোচনা দেশের কার্ডভিত্তিক অর্থনীতির দ্রুত বিকাশের একটি পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরেছে। পাঁচ বছরে কার্ডের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ এবং লেনদেনের পরিমাণ ৯১ শতাংশ বৃদ্ধির অর্থ হলো, নগদ অর্থের পাশাপাশি বিকল্প লেনদেনব্যবস্থা দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে ক্রেডিট কার্ডের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি, বিদেশি নাগরিকদের দেশে কার্ড ব্যবহার বৃদ্ধি এবং দেশের বাইরে বাংলাদেশি কার্ডধারীদের বড় অঙ্কের ব্যয়, সব মিলিয়ে কার্ড এখন দেশের আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতে এই প্রবণতা আরও বাড়লে ব্যাংক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদের জন্য নিরাপদ, স্বচ্ছ ও গ্রাহকবান্ধব কার্ডভিত্তিক লেনদেন অবকাঠামো নিশ্চিত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
