নিজস্ব প্রতিবেদক
একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ শরিয়াহ্ভিত্তিক ইসলামী ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিযুক্ত প্রশাসকেরা দায়িত্ব ছেড়ে নিজেদের মূল কর্মস্থলে ফিরে গেছেন। এর মধ্য দিয়ে এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর নিজস্ব ব্যবস্থাপনার হাতে ব্যাংকগুলোর পরিচালন দায়িত্ব পুরোপুরি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে।
সর্বশেষ গত ১৩ আগস্ট ইউনিয়ন ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের দায়িত্ব সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এর আগে ৩০ জুন এক্সিম ব্যাংক, ৬ আগস্ট সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ১০ আগস্ট ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়। ফলে পাঁচ ব্যাংক থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশাসকেরা প্রত্যাহার হলেন। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে মো. আবেদুর রহমান সিকদার গত ১৬ জুলাই দায়িত্ব নেওয়ার পর ধাপে ধাপে এ হস্তান্তর সম্পন্ন করা হয়।
আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থতা, ব্যাপক তারল্য সংকট এবং বিপুল খেলাপি ঋণের কারণে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমান বিএনপি সরকারও সেই সিদ্ধান্ত অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে পাঁচ ব্যাংকের মোট আমানত ছিল প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৮৪ দশমিক ২২ শতাংশ।
তবে আমানতকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—তাঁদের আমানতের মূল টাকা নিরাপদ রাখার ঘোষণা দেওয়া হলেও তা একসঙ্গে ফেরত দেওয়া হচ্ছে না। গত বছরের শেষ দিকে ঘোষিত ব্যবস্থার আওতায় প্রাথমিকভাবে প্রতিটি হিসাবে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা তোলার সুযোগ দেওয়া হয়। দুই লাখ টাকার বেশি আমানত থাকা গ্রাহকদের ক্ষেত্রে প্রথমে ২ লাখ টাকা এবং এরপর প্রতি তিন মাস পরপর ১ লাখ টাকা করে সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত উত্তোলনের ব্যবস্থা রাখা হয়।
পরবর্তীতে জরুরি প্রয়োজনের ক্ষেত্রেও উত্তোলনের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। গত ২৯ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, একীভূত পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকেরা নিজেদের পাশাপাশি মা-বাবা, সন্তান, ভাই-বোন ও স্বামী বা স্ত্রীর চিকিৎসাসহ অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত তুলতে পারবেন। আগে এ সুবিধা মূলত নিজের চিকিৎসার ক্ষেত্রে সীমিত ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আমানতকারীদের মূল অর্থ পর্যায়ক্রমে ফেরত দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ২০২৬ সাল থেকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতের বিপরীতে বাজারভিত্তিক মুনাফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এক বছরের বেশি মেয়াদি আমানতে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৫ শতাংশ এবং এক বছরের কম মেয়াদি আমানতে ৯ শতাংশ হারে মুনাফার কথা জানানো হয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য সরকার অনুকম্পা হিসেবে ৪ শতাংশ মুনাফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, যার জন্য সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
তবে আমানতকারীদের পুরো অর্থ ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে এখনো ধৈর্য ধরতে হচ্ছে। বিশেষ করে বড় অঙ্কের আমানতকারীদের টাকা নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করা হবে। ফলে প্রশাসকদের প্রত্যাহারের পর নতুন ব্যবস্থাপনার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি, খেলাপি ঋণ আদায় এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার ব্যাংকটিতে ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। বাকি অর্থের একটি অংশ আমানত সুরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে জোগান দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফলে প্রশাসকদের বাংলাদেশ ব্যাংকে ফিরে যাওয়া পাঁচ ব্যাংকের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপের সমাপ্তি হলেও প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে আমানতকারীরা কত দ্রুত ও কী পরিমাণ অর্থ হাতে পান তার ওপর। এখন নতুন ব্যবস্থাপনার প্রধান দায়িত্ব হলো ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিক করা এবং ধাপে ধাপে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকার আমানতের বিপরীতে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ নিশ্চিত করা।
