মিরাজের পাঁচ উইকেট, তানজিদের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি॥ ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর অপেক্ষায় টাইগাররা
নিজস্ব প্রতিবেদক
ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে সাদা পোশাকে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যে গল্প লিখছে, তা শুধু একটি টেস্ট ম্যাচের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের পরিণত হয়ে ওঠার এক ঐতিহাসিক দলিল। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে টাইগাররা। স্বাগতিকদের ২৮৪ রানে অলআউট করে জয়ের জন্য বাংলাদেশের সামনে এসেছে মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য। আর এই লক্ষ্য তাড়ার আগে বাংলাদেশের জয়ের মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছেন বোলার ও ব্যাটাররা মিলে।
এই ম্যাচের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম মেহেদী হাসান মিরাজ। দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং ধস নামাতে বল হাতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বাংলাদেশের এই অলরাউন্ডার। ৬৬ রান দিয়ে পাঁচ উইকেট নিয়ে মিরাজ শুধু অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরোধ ভাঙেননি, নিজের টেস্ট ক্যারিয়ারে যোগ করেছেন আরও একটি পাঁচ উইকেটের কীর্তি। এটি টেস্ট ক্রিকেটে তার ১৫তম পাঁচ উইকেট।
মিরাজের ঘূর্ণির সঙ্গে হাসান মাহমুদের কার্যকর পেস আক্রমণও অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংকে চাপে রেখেছে। দ্বিতীয় ইনিংসে হাসান মাহমুদ নিয়েছেন তিন উইকেট। এর আগে প্রথম ইনিংসে তার বিধ্বংসী বোলিংয়েই মাত্র ১৯৮ রানে গুটিয়ে গিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। প্রথম ইনিংসে ৫৫ রানে ছয় উইকেট নিয়ে হাসান যে ধাক্কা দিয়েছিলেন, সেটিই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বড় লিডের ভিত তৈরি করে।
অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাট হাতে দেখিয়েছে অসাধারণ আত্মবিশ্বাস। ৪২৬ রানের বিশাল সংগ্রহ গড়ে স্বাগতিকদের ওপর ২২৮ রানের লিড নেয় টাইগাররা। সেই ইনিংসের সবচেয়ে বড় নায়ক তরুণ ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। মাত্র দ্বিতীয় টেস্টেই ১০১ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলে তিনি গড়েছেন ইতিহাস। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সেঞ্চুরি করা প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার হয়েছেন তানজিদ। ১৯৭ বলের ইনিংসে ছিল আটটি চার ও একটি ছক্কা।
তানজিদের এই সেঞ্চুরি ছিল নিছক ব্যক্তিগত মাইলফলক নয়; এটি ছিল অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে বাংলাদেশের ব্যাটিং সামর্থ্যের বড় ঘোষণা। প্যাট কামিন্স, মিচেল স্টার্ক, জশ হ্যাজলউড ও নাথান লায়নের মতো বিশ্বমানের বোলারদের সামনে তানজিদের ধৈর্য, নির্বাচিত শট এবং মানসিক দৃঢ়তা বাংলাদেশের ব্যাটিংকে নতুন আত্মবিশ্বাস দিয়েছে।
তানজিদের সঙ্গে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ রানের ইনিংসও বাংলাদেশের বড় সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মুমিনুল হকের ৪৯ রানও ইনিংসকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করে। পরে মিরাজ নিজেও ব্যাট হাতে ৬৫ রান করে দলের লিডকে আরও সমৃদ্ধ করেন।
অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যামেরন গ্রিনের ১০৪ রানের লড়াকু সেঞ্চুরি কিছুটা সময়ের জন্য বাংলাদেশের জয় বিলম্বিত করলেও মিরাজের ঘূর্ণি শেষ পর্যন্ত সেই প্রতিরোধ ভেঙে দেয়। অস্ট্রেলিয়া ২৮৪ রানে অলআউট হওয়ায় বাংলাদেশের সামনে আসে মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য।
অর্থাৎ, ইতিহাস এখন বাংলাদেশের হাতের মুঠোয়। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয়ের জন্য প্রয়োজন মাত্র ৫৭ রান। লক্ষ্য ছোট হলেও টেস্ট ক্রিকেটে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই। অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণ এখনও শক্তিশালী। জয়ের পথে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে স্নায়ু ধরে রাখা এবং শুরুতেই অযথা ঝুঁকি না নেওয়া।
তবে এই ম্যাচে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের যে ক্রিকেট দেখা গেছে, তাতে আত্মবিশ্বাসী হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথমে হাসান মাহমুদের আগুনঝরা পেস, এরপর তানজিদ হাসানের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি, বাংলাদেশের ৪২৬ রানের দুর্দান্ত সংগ্রহ এবং সবশেষে মিরাজের পাঁচ উইকেট—প্রতিটি অধ্যায়ই যেন এক ঐতিহাসিক জয়ের দিকে বাংলাদেশকে ঠেলে দিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো বাংলাদেশের জন্য শুধু আরেকটি টেস্ট জয় হবে না। এটি হবে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান, আত্মবিশ্বাসের নতুন দরজা এবং বিশ্ব টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থান জানান দেওয়ার এক শক্তিশালী মুহূর্ত। ৫৭ রান এখন শুধু একটি সংখ্যা; তার ওপারে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি।
টাইগাররা এখন ইতিহাসের খুব কাছাকাছি। আর সেই ইতিহাসের দরজায় দাঁড়িয়ে পুরো বাংলাদেশ অপেক্ষা করছে—সাদা পোশাকে আরেকটি অবিস্মরণীয় বিজয়ের জন্য।
