তীব্র লোডশেডিংয়ের মধ্যেই ১০০ শতাংশ মার্জিনের শর্ত শিথিল, ছাড় কার্যকর থাকবে ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত
নিজস্ব প্রতিবেদক
আলোচিত ও বিতর্কিত এস. আলম গ্রুপের যৌথ মালিকানায় প্রতিষ্ঠিত বিদ্যুৎকেন্দ্র ‘এসএস পাওয়ার-১ লিমিটেডের’ অনুকূলে আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলার ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রূপালী ব্যাংক পিএলসিকে ১০০ শতাংশ মার্জিনে আমদানি এলসি খোলার সুযোগ দিতে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর একটি নির্দিষ্ট বিধান আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত কার্যকর না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-২ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে স্বাক্ষর করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মোঃ কবির আহাম্মদ।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ১২১ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এসএস পাওয়ার-১ লিমিটেডের অনুকূলে রূপালী ব্যাংক পিএলসি কর্তৃক ১০০ শতাংশ মার্জিনে আমদানি ঋণপত্র খোলার ক্ষেত্রে একই আইনের ২৭কক(৩) ধারার বিধান আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত কার্যকর করা হবে না।
তবে এ বিশেষ সুবিধার সঙ্গে কঠোর শর্তও জুড়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, এভাবে দেওয়া ঋণ-সুবিধার বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো দায় সৃষ্টি হবে না। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঋণ-সুবিধার কারণে রূপালী ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা দাবি করতে পারবে না।
অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তের ফলে এসএস পাওয়ার-১-এর জন্য এলসি খোলার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনগত বাধা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কার্যকর না থাকলেও এর আর্থিক দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানের ওপরই থাকবে।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে অবস্থিত এসএস পাওয়ার-১ বাংলাদেশের অন্যতম বড় বেসরকারি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। কেন্দ্রটির উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। এস. আলম গ্রুপের সঙ্গে চীনের সেপকো-৩ ও এইচটিজি গ্রুপের যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা থাকা এই কেন্দ্রের জন্য আমদানি কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে এলসি খোলার সুবিধাটি দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে ধারণা করা হচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম আমদানিতে বৈদেশিক বাণিজ্যিক লেনদেনের সুযোগ থাকা প্রকল্পটির পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের সময় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি এবং ব্যাপক লোডশেডিংয়ের মধ্যে এসএস পাওয়ার-১-এর মতো একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের আমদানি এলসি খোলার সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি সরবরাহ, কয়লা আমদানি ও অর্থায়নসহ বিভিন্ন কারণে কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যাহত হলে জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে এস. আলম গ্রুপকে ঘিরে অতীতে ব্যাংকিং খাত, ঋণ সুবিধা ও আর্থিক অনিয়ম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা ও অভিযোগ থাকায় প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ বিবেচনায় সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনে এসএস পাওয়ার-১কে দেওয়া এই সুবিধার কারণ বা বিশেষ বিবেচনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। শুধু আইনগত একটি বিধান নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কার্যকর না রাখার সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, ১০০ শতাংশ মার্জিনে এলসি খোলার অর্থ হলো সংশ্লিষ্ট আমদানির বিপরীতে প্রয়োজনীয় অর্থের সমপরিমাণ মার্জিন ব্যাংকে সংরক্ষিত রেখেই এলসি খোলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ফলে এটি সরাসরি বিনা মার্জিনে আমদানি সুবিধা নয়; বরং বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য আইনগত বিধিনিষেধের বিশেষ প্রয়োগ না করার সিদ্ধান্ত।
সব মিলিয়ে, জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ ও লোডশেডিংয়ের মধ্যে এসএস পাওয়ার-১-এর আমদানি কার্যক্রম সচল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই বিশেষ অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক দায় না নেওয়ার শর্ত এবং রূপালী ব্যাংকের ওপর দায়ভার রাখার বিষয়টিও প্রজ্ঞাপনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত এই বিশেষ সুবিধা কার্যকর থাকায় প্রকল্পটির আমদানি কার্যক্রম ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে এর বাস্তব প্রভাব আগামী দিনগুলোতে আরও স্পষ্ট হবে।

