প্রিমিয়ার সিমেন্টের সঙ্গে ঢাকা-আশুলিয়া প্রকল্প ঘিরে বিরোধ
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পকে কেন্দ্র করে প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস পিএলসি ও চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিয়াংসু প্রভিন্সিয়াল ট্রান্সপোর্টেশন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেডের (জেটিইজি) মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ গড়িয়েছে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে। প্রিমিয়ার সিমেন্টের করা সালিসি আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত আবেদনটি গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রতি নোটিশ জারি করেছেন। একই সঙ্গে বিরোধের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জেটিইজির অর্থ পরিশোধ ও বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জেটিইজির পাশাপাশি প্রকল্প প্রতিনিধি ডেং হুয়া জিয়াং, প্রকল্প পরিচালক জি লিঙ, ম্যাটেরিয়াল প্রভিন্সিয়াল ম্যানেজার জং অ্যাজিং, কন্ট্রাক্টর রিপ্রেজেন্টেটিভ ওয়াং ইয়া বো’রও ব্যাংক হিসাব স্থগিত রাখা হয়েছে।
হাইকোর্ট বিভাগের বিশেষ মূল এখতিয়ারাধীন সালিসি আবেদনটি ‘আরবিট্রেশন অ্যাপ্লিকেশন নম্বর ২৯ অব ২০২৬’ হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস পিএলসি আবেদনকারী এবং জেটিইজির প্রকল্প প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রধান প্রতিপক্ষ। আবেদনে সালিসি আইন, ২০০১-এর ৭(ক) ধারা এবং দেওয়ানি কার্যবিধির ১৫১ ধারার অধীনে আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে। প্রাপ্ত আদালতের আদেশের কপি অনুযায়ী, আবেদনটি ৪ জুন ২০২৬ তারিখে আদালতে উপস্থাপিত হয় এবং আদালত সেটি গ্রহণ করে প্রতিপক্ষদের প্রতি নিয়মিত নোটিশ জারির নির্দেশ দেন। নোটিশের খরচ আবেদনকারীকে বহন করতে বলা হয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, মূল আবেদনটির শুনানি ও নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আদালত অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে জেটিইজির পাওনা অর্থ ছাড় বা পরিশোধের বিষয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এমন কোনো অর্থ জেটিইজির অনুকূলে ছাড় বা পরিশোধ করবে না, যার ওপর বিরোধের প্রভাব রয়েছে।
একই সঙ্গে আদালত জেটিইজির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রথম থেকে পঞ্চম প্রতিপক্ষকে তাদের নামে থাকা ব্যাংক হিসাবের অর্থ বিদেশে স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে হস্তান্তর, রেমিট, নগদায়ন, উত্তোলন কিংবা অন্য কোনোভাবে স্থানান্তরের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। এই নির্দেশের মেয়াদ প্রাথমিকভাবে তিন মাস অথবা আদালতের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত, যেটি আগে ঘটে কার্যকর থাকবে।
আদালতের এই নির্দেশের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংককেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভূমিকা পালনের অবস্থানে রাখা হয়েছে। মামলার পক্ষ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে ষষ্ঠ প্রতিপক্ষ করা হয়েছে। সপ্তম প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সচিব এবং অষ্টম প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান। চীনা দূতাবাসের একজন কাউন্সেলরকে প্রো-ফরমা প্রতিপক্ষ হিসেবে রাখা হয়েছে। ফলে মামলাটি কেবল দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক বিরোধে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রকল্পের অর্থপ্রবাহ, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা এবং বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি বৃহত্তর বিরোধে পরিণত হয়েছে বলে নথি থেকে প্রতীয়মান হয়।
বিরোধের পেছনে ঢাকা-আশুলিয়া প্রকল্প : মামলার দুই প্রধান পক্ষের বাণিজ্যিক সম্পর্কের সূত্র পাওয়া যায় ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, এ প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য প্রিমিয়ার সিমেন্টকে সরবরাহকারী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছিল এবং জেটিইজির সঙ্গে প্রিমিয়ার সিমেন্টের একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়।
ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটি বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের অধীনে বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের মূল ঠিকাদার হিসেবে চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশন বা সিএমসি কাজ করছে এবং জেটিইজি প্রকল্পটির দ্বিতীয় অংশের নির্মাণকাজে যুক্ত রয়েছে। সরকারি প্রকল্প-সংক্রান্ত নথিতেও জেটিইজিকে ৯ দশমিক ৫ কিলোমিটার থেকে ১৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার অংশের উপ-ঠিকাদার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পটির সঙ্গে জেটিইজির সম্পৃক্ততা আরও পুরোনো। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রকল্পতথ্য অনুযায়ী, জেটিইজি ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট করিডরের উড়াল অংশ, টঙ্গী সেতু, উড়ালপথ এবং সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক অবকাঠামো নির্মাণের কাজেও যুক্ত ছিল।
চীনের জেটিইজি নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রতিষ্ঠানটিকে মহাসড়ক, বন্দর ও চ্যানেল, পৌর অবকাঠামো, সেতু, সড়কভিত্তি, পেভমেন্টসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে প্রথম শ্রেণির ঠিকাদারি সক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিদেশে ব্যবসা পরিচালনার অনুমোদনও রয়েছে বলে তাদের করপোরেট প্রোফাইলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস পিএলসি বাংলাদেশের তালিকাভুক্ত অন্যতম বড় সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। কোম্পানিটির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় ২০০৪ সালের ১২ মার্চ, প্রাথমিকভাবে বার্ষিক ৬ লাখ টন উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে। পরবর্তী সময়ে উৎপাদন সক্ষমতা ধারাবাহিকভাবে বাড়ানো হয়। কোম্পানির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে এর মোট উৎপাদন সক্ষমতা বছরে প্রায় ৮০ লাখ টন।
প্রতিষ্ঠানটি দেশের বিভিন্ন বড় অবকাঠামো প্রকল্পে সিমেন্ট সরবরাহ করেছে বলে কোম্পানির নিজস্ব ওয়েবসাইটে উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে পদ্মা সেতু, ঢাকা মেট্রোরেল, চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, কর্ণফুলী টানেল, কক্সবাজার রেললাইনসহ বিভিন্ন প্রকল্পের নাম রয়েছে।
প্রিমিয়ার সিমেন্ট ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত। কোম্পানির সর্বশেষ প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পরিচালনা কাঠামো, আর্থিক ও করপোরেট তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। কোম্পানির করপোরেট কার্যালয় ঢাকার কারওয়ান বাজারের টিকে ভবনে এবং উৎপাদন কারখানা মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুরে অবস্থিত।
আদালতের নির্দেশের তাৎপর্য: হাইকোর্টের অন্তর্বর্তী নির্দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির আগে সংশ্লিষ্ট অর্থ যেন এমনভাবে সরিয়ে নেওয়া না হয়, যাতে ভবিষ্যতে আদালত বা সালিসি প্রক্রিয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার মাধ্যমে আদালত বিরোধপূর্ণ অর্থ ও সম্পদের বিষয়ে একটি সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা নিয়েছেন।
তবে এই আদেশের অর্থ এই নয় যে আদালত ইতোমধ্যে প্রিমিয়ার সিমেন্টের দাবিকে চূড়ান্তভাবে সঠিক অথবা জেটিইজিকে দায়ী ঘোষণা করেছেন। আদালতের নথিটি মূলত আবেদন গ্রহণ, প্রতিপক্ষদের নোটিশ এবং শুনানি চলাকালে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দেওয়ার পর্যায়ের। মামলার মূল বিরোধ, অর্থ পাওয়ার অধিকার কিংবা চূড়ান্ত দায়-দায়িত্ব সম্পর্কে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এই নথিতে নেই।
ফলে আগামী শুনানিতে উভয় পক্ষের বক্তব্য, চুক্তির শর্ত, পাওনা অর্থের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথি এবং সালিসি প্রক্রিয়ার আইনি ভিত্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আদালত পরবর্তী সময়ে বর্তমান অন্তর্বর্তী নির্দেশ বহাল, পরিবর্তন বা প্রত্যাহার করতে পারেন এবং মূল আবেদন নিষ্পত্তির পর বিরোধের চূড়ান্ত আইনি অবস্থানও নির্ধারিত হবে। এই পর্যায়ে মামলাটি বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিদেশি ঠিকাদার ও স্থানীয় সরবরাহকারীর মধ্যকার বাণিজ্যিক বিরোধ, প্রকল্পের অর্থপ্রবাহ এবং বিদেশে অর্থ স্থানান্তরের ঝুঁকি; এই তিনটি বিষয়কে একই সঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে তিন মাসের জন্য অর্থ স্থানান্তর ও সংশ্লিষ্ট অর্থ ছাড়ে আদালতের হস্তক্ষেপ ভবিষ্যৎ শুনানিকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে ব্যবহৃত হবে প্রিমিয়ার সিমেন্ট, চীনা প্রতিষ্ঠান জেটিইজির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর
