এডিআর সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্তিতে কঠোর শর্ত, ন্যূনতম ৭০ নম্বর পেলে মিলবে অনুমোদন
নিজস্ব প্রতিবেদক
খেলাপি ঋণ আদায় কার্যক্রম ত্বরান্বিত এবং আদালতে বিচারাধীন ঋণসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-২ ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর)-এর জন্য মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তিকরণ সংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। আজ বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) জারি করা এ নীতিমালা অবিলম্বে কার্যকর হবে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, এডিআর কার্যক্রম পরিচালনায় এখন থেকে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, মানবসম্পদ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, আর্থিক সক্ষমতা ও নৈতিক মানদণ্ড পূরণ করা প্রতিষ্ঠানকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের খেলাপি ঋণসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে এসব প্রতিষ্ঠান মধ্যস্থতার সুযোগ পাবে।
তালিকাভুক্তির জন্য আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধিত হতে হবে এবং হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স ও আয়কর শনাক্তকরণ নম্বর থাকতে হবে। প্রতিষ্ঠান বা এর পরিচালনা পর্ষদের কোনো সদস্যকে ঋণখেলাপি, প্রতারণা, দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ বা মানি লন্ডারিংসহ গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত হওয়া যাবে না। পাশাপাশি আবেদন দাখিলের আগে অন্তত তিন বছরের ব্যবসায়িক বা পেশাগত অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। গত তিন বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী, প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক হিসাব এবং সেই হিসাবের মাধ্যমে সব আর্থিক লেনদেন পরিচালনার শর্তও রাখা হয়েছে।
নীতিমালায় আরো বলা হয়, মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি প্যানেলে কমপক্ষে পাঁচজন মধ্যস্থতাকারী থাকতে হবে। এর মধ্যে একজন হিসাববিদ ও একজন আইন বিশেষজ্ঞ থাকতে হবে। মধ্যস্থতাকারীদের ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, আইন, হিসাবরক্ষণ, নিরীক্ষা বা বিচারিক কাজে কমপক্ষে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। একই সঙ্গে তাদের ঋণখেলাপি, দেউলিয়া বা গুরুতর অনিয়মে জড়িত হওয়ার রেকর্ড থাকা চলবে না। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্যানেলে অন্তর্ভুক্তিরও সুযোগ রাখা হয়নি।
পেশাগত মান ধরে রাখতে প্রতি বছর অন্তত দুটি এডিআর প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, একটি দক্ষতা উন্নয়ন কর্মশালা এবং প্যানেলভুক্ত মধ্যস্থতাকারীদের জন্য ন্যূনতম ২০ ঘণ্টার ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে মধ্যস্থতা কক্ষ, পৃথক গোপন বৈঠকের কক্ষ, নথি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং বয়স্ক ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সেবাগ্রহীতাদের উপযোগী সুবিধা থাকতে হবে। অনলাইন ও ভার্চুয়াল শুনানির জন্য প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, ডিজিটাল মামলা ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা এবং তথ্যের ব্যাকআপ ও পুনরুদ্ধার ব্যবস্থাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
নীতিমালায় স্বার্থের সংঘাত এড়ানো, গোপনীয়তা, নিরপেক্ষতা, স্বাধীনতা, জবাবদিহি ও পেশাগত আচরণ নিশ্চিত করতে কঠোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কোনো তথ্য আইন, আদালতের আদেশ বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের অনুমতি ছাড়া তৃতীয় পক্ষের কাছে প্রকাশ করা যাবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তালিকাভুক্তির মূল্যায়নে মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে কমপক্ষে ৭০ নম্বর পেতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজন হলে আবেদনকারীর কার্যালয় ও অবকাঠামো সরেজমিন পরিদর্শন এবং নথিপত্র যাচাই করতে পারবে। তালিকাভুক্তির মেয়াদ হবে তিন বছর; মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ৯০ দিন আগে নবায়নের আবেদন করতে হবে।
তবে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া, গোপনীয়তা ভঙ্গ, স্বার্থের সংঘাত গোপন করা, পেশাগত নৈতিকতা লঙ্ঘন কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করলে তালিকাভুক্তি স্থগিত বা বাতিল হতে পারে। সেবাগ্রহীতার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সতর্কীকরণ, আর্থিক জরিমানা, স্থগিত বা বাতিলের মতো ব্যবস্থাও নিতে পারবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
নীতিমালার ফলে খেলাপি ঋণসংক্রান্ত বিরোধ আদালতের বাইরে দক্ষ ও নিরপেক্ষ মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তির একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হবে। একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়মিত নজরদারি এবং বার্ষিক প্রতিবেদন দাখিল বাধ্যতামূলক হওয়ায় এডিআর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর পথও তৈরি হলো।
