loader image
শিরোনাম

সিঙ্গাপুরের নাগরিক সেজে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মামলা করেছে এস আলম

আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে লড়ছে বাংলাদেশও

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের ব্যাংক খাত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগে আলোচিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলমের বিরুদ্ধে যখন অর্থ উদ্ধারে তৎপরতা চালাচ্ছে সরকার, ঠিক সেই সময়ে উল্টো বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে মামলা করেছেন এস আলম গোষ্ঠীর কর্ণধার মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশ সরকারের কাছে বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন তারা।

বিশ্বব্যাংকের অধীন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি কেন্দ্রের মাধ্যমে করা এ মামলায় বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা ও সম্পদের বিরুদ্ধে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপকে বিনিয়োগ অধিকার লঙ্ঘন হিসেবে দাবি করা হয়েছে। ২০০৪ সালে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তির আওতায় মামলাটি করা হয়েছে। মামলায় সাইফুল আলম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে তাদের বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন।

মামলায় বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দুইশ কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণের দাবির কথা উল্লেখ করা হলেও এ অঙ্কের বিষয়ে প্রকাশ্য নির্ভরযোগ্য নথি থেকে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে সালিশি প্রক্রিয়ায় চূড়ান্তভাবে কত অর্থ দাবি করা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট নথির ভিত্তিতেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে।

এদিকে এস আলম গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে অর্থ আত্মসাৎ, ঋণ অনিয়ম, অর্থ পাচার ও ব্যাংক খাতকে ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগে তদন্ত ও আইনি কার্যক্রম চলছে। বিভিন্ন তদন্তে এস আলম গোষ্ঠী ও তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিদেশে বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠে এসেছে। সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে সম্পদ গড়ে তোলা এবং অর্থ স্থানান্তরের বিষয়ও তদন্তের আওতায় এসেছে।

অভিযোগ রয়েছে, দেশের অন্তত ১৩টি ব্যাংক থেকে এস আলম গোষ্ঠী ও সংশ্লিষ্টদের নামে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়েছে। এসব ঋণের একটি বড় অংশ অনিয়মের মাধ্যমে নেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে অর্থ বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা বর্তমানে এসব ঋণ, সম্পদ ও অর্থের উৎস অনুসন্ধান করছে।

এস আলম গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগের মধ্যেই আন্তর্জাতিক সালিশি মামলা বাংলাদেশের জন্য নতুন ধরনের আইনি ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। মামলায় বাংলাদেশে তাদের সম্পদ জব্দ, ব্যাংক হিসাব নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ওপর নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।

মামলাটি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইন প্রতিষ্ঠান হোয়াইট অ্যান্ড কেইসকে নিয়োগ দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির আইনজীবীদের জন্য প্রতি ঘণ্টায় এক হাজার ২৫০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত পারিশ্রমিক অনুমোদনের তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। মামলার প্রস্তুতি, নথি পর্যালোচনা, আইনি পরামর্শ, আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ এবং সালিশি কার্যক্রমে অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন কাজের জন্য এই পারিশ্রমিক প্রযোজ্য হবে।

অন্যদিকে সাইফুল আলম ও তাঁর পরিবারের পক্ষে আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠান কুইন এমানুয়েল উরকুহার্ট অ্যান্ড সুলিভান আইনি লড়াই পরিচালনা করছে। ফলে দেশের ব্যাংক খাত থেকে অর্থ উদ্ধারের চলমান প্রক্রিয়া এখন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধের আইনি লড়াইয়ের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে।

মামলা পরিচালনায় বাংলাদেশের বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন সূত্রে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ের কথা বলা হলেও এ পর্যন্ত প্রকাশ্য সরকারি নথিতে মোট ব্যয়ের এই অঙ্কটি নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়নি। তবে আইনজীবী প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুমোদিত উচ্চ পারিশ্রমিকের কারণে মামলাটি দীর্ঘায়িত হলে সরকারের ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করছে, ব্যাংক খাতের অনিয়মের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারের সুযোগ রয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে জানানো হয়েছে, অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের সম্পদ শনাক্ত, জব্দ এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

সাইফুল আলমের করা মামলায় শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কোনো আর্থিক দায় নির্ধারিত হবে কি না, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক সালিশি ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের ওপর। বাংলাদেশের জন্য এ মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে, ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও অর্থ পাচারের অভিযোগের ভিত্তিতে নেওয়া রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপগুলো আইনসম্মত এবং জনস্বার্থে নেওয়া হয়েছে—এটি যথাযথ প্রমাণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা।

অন্যদিকে সাইফুল আলম পক্ষকে প্রমাণ করতে হবে, বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ তাদের বৈধ বিদেশি বিনিয়োগের অধিকার লঙ্ঘন করেছে এবং এর ফলে তারা প্রকৃত আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছে।

এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক সালিশি কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের একটি সালিশি ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। ফলে মামলাটি এখন আনুষ্ঠানিক বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছে। একদিকে ব্যাংক খাত থেকে কথিতভাবে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারে বাংলাদেশের তৎপরতা, অন্যদিকে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে বিপুল ক্ষতিপূরণের দাবি; দুই দিক থেকেই মামলাটি দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

শেষ পর্যন্ত এই সালিশি মামলার রায় শুধু বাংলাদেশ সরকারকে সম্ভাব্য আর্থিক দায়ের মুখে ফেলবে কি না, সেটিই নির্ধারণ করবে না; বরং দেশের ব্যাংক খাতে অনিয়ম, অর্থ পাচার এবং বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারে রাষ্ট্রের নেওয়া পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে কতটা গ্রহণযোগ্য, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করতে পারে।

Please follow and like us:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top