নিজ্স্ব প্রতিবেদক
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামীপন্থী হিসেবে পরিচিত বঙ্গবন্ধুর চেতনায় উজ্জীবিত এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অপ্রতিরোধ্য ‘বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’ নামক একটি সংগঠন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত ও শাস্তিমূলক প্রক্রিয়া বন্ধের আহবান জানিয়েছে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন সংগঠনের সভাপতি প্রফেসর ড. এম ওয়াহিদুজ্জামান এবং সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. মাহবুবুর রহমান।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সম্প্রতি একটি অনলাইন পোর্টালে ‘শেখ হাসিনাকে ফেরাতে ২২ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ শিক্ষকের গোপন তৎপরতা’ শিরোনামে একটি ভিত্তিহীন, বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে অসংখ্য ভুল, অসঙ্গতি ও মনগড়া তথ্যের উপস্থিতি স্পষ্ট। প্রতিবেদনটির বিরুদ্ধে যথাযথ তথ্য-উপাত্তসহ ইতোমধ্যে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, প্রকাশিত ওই সংবাদের তথ্যের সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই না করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, কুড়িগ্রাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষককে ঘিরে তদন্ত কমিটি বা তথাকথিত ‘ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, মতাদর্শগত বিরোধ কিংবা অতীতের রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে এসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ভিত্তিহীন সংবাদকে কেন্দ্র করে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষক সমাজকে রাষ্ট্রবিরোধী কিংবা কোনো ‘গোপন তৎপরতার’ সঙ্গে যুক্ত করার প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কোনো সংবাদ প্রতিবেদনকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করে শিক্ষকদের হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, প্রশাসনিক চাপ কিংবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি করা ন্যায়বিচার, প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের পরিপন্থী।
বাংলাদেশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ একটি অরাজনৈতিক সংগঠন, যা মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে উজ্জীবিত। দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা যেসব অন্যায়, বৈষম্য, হেনস্তা ও একাডেমিক নিপীড়নের মুখোমুখি হয়েছেন, তাদের সাংবিধানিক অধিকার, ন্যায়বিচার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিতে সংগঠনটি নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে। এসব কার্যক্রম প্রকাশ্য, নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ; এগুলোকে কোনোভাবেই ‘গোপন তৎপরতা’ হিসেবে অভিহিত করা সমীচীন নয়।
আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই—একজন শিক্ষক কোনোভাবেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে পারেন না। একজন শিক্ষক কোন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করেন, অতীতে কী রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছেন কিংবা ব্যক্তিগতভাবে কারও সঙ্গে মতপার্থক্য রয়েছে—এসব কোনোভাবেই তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ভিত্তি হতে পারে না। রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ বা ব্যক্তিগত বিরোধকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় হলো মুক্তচিন্তা, জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, যুক্তিবোধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। শিক্ষকদের ভয় দেখিয়ে, অপমানিত করে, চাকরির নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রেখে কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে শাস্তির মুখোমুখি করলে শুধু শিক্ষকসমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না; এর সরাসরি প্রভাব পড়বে শিক্ষার্থী, গবেষণা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ এবং দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার ওপর।
সংগঠনটির দাবি:
১. ২২টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০৪ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, মতাদর্শগত বিবেচনা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে পরিচালিত সকল তদন্ত ও শাস্তিমূলক প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
২. মিথ্যা, ভিত্তিহীন, বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগের ভিত্তিতে গঠিত তদন্ত বা তথাকথিত ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটিগুলো বাতিল করতে হবে।
৩. ভিত্তিহীন সংবাদ বা অসমর্থিত অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো শিক্ষককে হয়রানি, অপমান কিংবা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি করা থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিরত থাকতে হবে।
৪. কোনো শিক্ষকের রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ, অতীতের রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত মতপার্থক্যকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ভিত্তি করা যাবে না।
৫. বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, শিক্ষকতার মর্যাদা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও একাডেমিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
৬. বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ভয়ভীতি, হয়রানি, প্রশাসনিক চাপ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পরিবেশ বন্ধ করে প্রশাসনকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ভুমিকা নিতে হবে।
