নিজস্ব প্রতিবেদক
বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সামগ্রিক প্রভাব কমলেও নিরাপত্তা ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। বরং সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা, সীমান্তপারের সহিংসতা এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে। ২০২৬ সালের গ্লোবাল টেররিজম ইনডেক্স বা জিটিআই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমনই এক বৈপরীত্যের চিত্র। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে সন্ত্রাসী হামলায় ৫ হাজার ৫৮২ জন নিহত হয়েছেন এবং হামলার ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ৯৪৪টি। তবে আগের বছরের তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যা ২৮ শতাংশ এবং হামলার ঘটনা ২২ শতাংশ কমেছে।
জিটিআই ২০২৬-এর হিসাবে বাংলাদেশ ১৬৩টি দেশের মধ্যে ৪২তম অবস্থানে রয়েছে। দেশটির সন্ত্রাসের প্রভাবের স্কোর ২.২৮৬, যা তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রভাবের ভিত্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান আগের বছরের তুলনায় কিছুটা উন্নত হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে ঝুঁকিমুক্ত নয়। ২০১৬ সালে দেশটির অবস্থান ছিল ২৯তম এবং স্কোর ছিল ৪.৮৬।
বাংলাদেশের তুলনায় ভারতের অবস্থান অনেক ওপরে, অর্থাৎ সন্ত্রাসের প্রভাবের দিক থেকে ভারত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। জিটিআই ২০২৬-এ ভারত ১৩তম অবস্থানে রয়েছে এবং দেশটির স্কোর ৬.৪২৮। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সন্ত্রাসের প্রভাবের মাত্রায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। জিটিআইয়ের স্কোর যত বেশি, সন্ত্রাসের প্রভাব তত বেশি। সূচকে মৃত্যুর পাশাপাশি সন্ত্রাসী হামলা, আহত ব্যক্তি ও জিম্মি হওয়ার ঘটনাকেও বিবেচনায় নেওয়া হয় এবং পাঁচ বছরের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে স্কোর নির্ধারণ করা হয়।
তবে দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। জিটিআই প্রতিবেদনে পাকিস্তানকে প্রথমবারের মতো বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সন্ত্রাসপ্রভাবিত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৫ সালে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী হামলায় ১ হাজার ১৩৯ জন নিহত এবং ১ হাজার ৪৫টি হামলার ঘটনা ঘটে। দেশটিতে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্বের সন্ত্রাস পরিস্থিতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর ভৌগোলিক কেন্দ্রে পরিবর্তন। জিটিআই বলছে, সাব-সাহারান আফ্রিকা এখন বৈশ্বিক সন্ত্রাসের কেন্দ্রস্থল। সন্ত্রাসে নিহতদের প্রায় ৭০ শতাংশই পাঁচটি দেশে—পাকিস্তান, বুরকিনা ফাসো, নাইজার, নাইজেরিয়া ও গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে—ঘটেছে। একই সময়ে সন্ত্রাসের প্রভাব ৮১টি দেশে কমেছে এবং বেড়েছে মাত্র ১৯টি দেশে।
সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর মধ্যেও পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। ইসলামিক স্টেট এখনো বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী সংগঠন। ২০২৫ সালে ইসলামিক স্টেট, জামাত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান এবং আল-শাবাব—এই চার সংগঠন সম্মিলিতভাবে বিশ্বের সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের প্রায় ৭০ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল। তবে এসব সংগঠনের মধ্যে টিটিপিই একমাত্র সংগঠন, যার কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে।
বাংলাদেশের জন্য জিটিআই ২০২৬-এর তুলনামূলক ভালো অবস্থান স্বস্তির খবর হলেও আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। বিশেষ করে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা, সীমান্তবর্তী এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা, অনলাইন উগ্রবাদ এবং তরুণদের উগ্রবাদে সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টা মোকাবিলায় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্য, বেকারত্ব ও উগ্রবাদী মতাদর্শের বিস্তার ঠেকাতে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ জরুরি।
সব মিলিয়ে জিটিআই ২০২৬-এর বার্তা হলো—বিশ্বে সন্ত্রাসের সামগ্রিক মাত্রা কমেছে, কিন্তু ঝুঁকির চরিত্র বদলেছে। বাংলাদেশের তুলনামূলক অবস্থান উন্নত হলেও প্রতিবেশী অঞ্চলে সন্ত্রাসের উচ্চ মাত্রা দেশের জন্য কৌশলগত সতর্কতার কারণ। তাই অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার পাশাপাশি আঞ্চলিক সহযোগিতা ও আন্তঃদেশীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাই ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
