loader image
শিরোনাম

ডেপুটি গভর্নর পদে ‘এলাকার ভোটার’কে সুপারিশ, হুইপের চিঠিতে চমক

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর পদে নিয়োগের জন্য একজন কর্মকর্তার নাম সুপারিশ করেছেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। তবে এই সুপারিশের পেছনে যে কারণটি তিনি নিজেই জানিয়েছেন, সেটিই তৈরি করেছে সবচেয়ে বেশি কৌতূহল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক স্বপন কুমার গোস্বামীকে ডেপুটি গভর্নর পদে নিয়োগ বা মনোনয়নের বিষয়টি সদয় বিবেচনার জন্য গত ২২ জুন অর্থমন্ত্রীকে চিঠি দেন হুইপ দুলু। চিঠিতে স্বপন কুমার গোস্বামীর দীর্ঘ কর্মজীবন, সততা, দক্ষতা, পেশাগত উৎকর্ষ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে অভিজ্ঞতার বিস্তর প্রশংসা করা হয়েছে। তুলে ধরা হয়েছে ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক স্থিতিশীলতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের অভিজ্ঞতাও।

চিঠিটি পড়লে মনে হতে পারে, বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী পদে একজন অত্যন্ত যোগ্য ও অপরিহার্য ব্যক্তিকে বেছে নেওয়ার জন্যই বুঝি এই সুপারিশ। কিন্তু গল্পের মোড় আসে চিঠির বাইরে গিয়ে হুইপের নিজের বক্তব্যে।

চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে হুইপ দুলু বলেন, ‘উনি আমার এলাকার ভোটার, সেই বিবেচনায় চিঠি দেওয়া হয়েছে।’

এই এক বাক্যেই অবশ্য সুপারিশের গল্পটি কিছুটা অন্য মাত্রা পেয়েছে। কারণ, চিঠিতে যেখানে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও আর্থিক খাতের সংস্কারে সম্ভাব্য অবদানের দীর্ঘ তালিকা, সেখানে সুপারিশের সরাসরি কারণ হিসেবে সামনে এসেছে ‘এলাকার ভোটার’ পরিচয়।

অবশ্য স্বপন কুমার গোস্বামীর যোগ্যতা নিয়ে চিঠিতে কোনো ঘাটতি রাখা হয়নি। বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং, আর্থিক খাতের তদারকি, নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। দেশের ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত সম্পর্কেও তার গভীর জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা, আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, জবাবদিহি বৃদ্ধি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামো শক্তিশালী করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কার্যক্রম চালাচ্ছে। এসব কাজে স্বপন কুমার গোস্বামীর অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করেছেন হুইপ।

অর্থাৎ সুপারিশপত্রে যোগ্যতার যে চিত্র আঁকা হয়েছে, তাতে ডেপুটি গভর্নর পদে তিনি কেন বিবেচিত হতে পারেন, তার বেশ কিছু যুক্তি রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়—যোগ্যতার পাশাপাশি ‘এলাকার ভোটার’ পরিচয়টি কি সুপারিশের জন্য আলাদা কোনো বাড়তি গুরুত্ব বহন করেছে?

সাধারণত রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, পেশাগত দক্ষতা ও সততার বিষয়গুলোই প্রধান বিবেচ্য হওয়ার কথা। সেখানে কোনো প্রার্থীকে নিজের এলাকার ভোটার হিসেবে সুপারিশ করার ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার জন্ম দিতে পারে।

আর এখানেই চিঠিটির সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক দিক—সুপারিশে জাতীয় আর্থিক খাতের সংস্কার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা ও আর্থিক স্থিতিশীলতার বড় বড় যুক্তি; আর সুপারিশকারীর নিজের ভাষ্যে কারণটি বেশ সরল—‘আমার এলাকার ভোটার।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে শেষ পর্যন্ত কাকে নিয়োগ দেওয়া হবে, সেটি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত। তবে দুলুর চিঠি অন্তত একটি প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে—রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ‘যোগ্য ব্যক্তি’ হওয়ার পর এলাকার ভোটার হওয়াটাও কি এখন সুপারিশের একটি বিশেষ যোগ্যতা?

স্বপন কুমার গোস্বামী বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের কমন সার্ভিস ডিপার্টমেন্ট-১ এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পরিচালক পদের উপরে নির্বাহী পরিচালক পদ রয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মে নির্বাহী পরিচালক হতে পদোন্নতি দিয়ে ডেপুটি গভর্নর নিয়োগ দেয় সরকার। একপদ নিচে থাকার পরও ডেপুটি গভর্নর নিয়োগের সুপারিশ নিয়ে বেশ হাসির খোরাক জন্মেছে।

Please follow and like us:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top