নিজস্ব প্রতিবেদক
আমদানি করে যুদ্ধ করা যায় না—নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে দেশের অভ্যন্তরেই যুদ্ধ সরঞ্জাম উৎপাদনের ওপর জোর দিয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি বলেছেন, একটি দেশের সামরিক শক্তি শুধু বিদেশ থেকে অস্ত্র ও সরঞ্জাম কেনার ওপর নির্ভরশীল হলে সংকটের সময়ে তা বড় দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে। তাই নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি প্রতিরক্ষা শিল্পকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে দেশের চাহিদা পূরণের পর উদ্বৃত্ত সরঞ্জাম রপ্তানি করা সম্ভব হয়।
রাজধানীতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে সেনাপ্রধান এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, আধুনিক যুদ্ধের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তি, অত্যাধুনিক সরঞ্জাম, যোগাযোগব্যবস্থা ও নিজস্ব সক্ষমতার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। ফলে প্রতিরক্ষা খাতে আত্মনির্ভরতা অর্জন এখন সময়ের দাবি।
সেনাপ্রধান বলেন, যুদ্ধের সরঞ্জাম আমদানি করে একটি যুদ্ধ পরিচালনা করা সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে শুধু আমদানিনির্ভর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কার্যকর নয়। কারণ যুদ্ধ বা বড় ধরনের সংকটের সময়ে সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সে কারণে দেশের সামরিক বাহিনীর প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেশেই উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিজেদের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম ও সামরিক সামগ্রী তৈরির সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে এগোচ্ছে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে, অন্যদিকে দেশের শিল্পখাতেও নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে।
জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, প্রতিরক্ষা শিল্পকে কেবল বাহিনীর প্রয়োজন মেটানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। উৎপাদন সক্ষমতা এমন পর্যায়ে নিতে হবে, যাতে দেশের চাহিদা পূরণের পর অতিরিক্ত সরঞ্জাম আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা যায়। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পাশাপাশি দেশের শিল্প ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।
তিনি প্রতিরক্ষা শিল্পে গবেষণা ও উদ্ভাবনের ওপরও গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে দক্ষ জনবল তৈরি, গবেষণা কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং বেসরকারি শিল্প খাতের সক্ষমতা কাজে লাগানো প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সেনাপ্রধানের এ বক্তব্য বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের ভবিষ্যৎ বিকাশের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা। দেশীয়ভাবে সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদন বাড়ানো গেলে প্রতিরক্ষা খাতে আমদানিনির্ভরতা কমার পাশাপাশি স্থানীয় শিল্প, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিরক্ষা শিল্পকে একটি সমন্বিত শিল্পখাতে পরিণত করতে হলে সরকারি প্রতিষ্ঠান, সামরিক বাহিনী, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজস্ব প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারলে ভবিষ্যতে শুধু নিজেদের চাহিদা পূরণ নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
