আল মুজাদ্দেদী
কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ও কোয়ান্টাম মেথডের কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে অনুসন্ধান শুরু করেছে সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা। এরই অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে নেমেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের ব্যাংক হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট লেনদেনের তথ্য চাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে ধ্যান, আত্মউন্নয়ন, মানবসেবা ও দাতব্য কার্যক্রম পরিচালনার দাবি করে আসা প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন সামনে এসেছে।
কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর শান্তিনগরে ৩১/ভি শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন সড়কে প্রতিষ্ঠানটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় রয়েছে। একই ঠিকানাকে কোয়ান্টাম মেথডের যোগাযোগের ঠিকানা হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের মধ্যে ধ্যানচর্চা, আত্মউন্নয়ন, রক্তদান, চিকিৎসাসেবা, এতিম শিশুদের সহায়তা, প্রবীণসেবা, দাতব্য কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমের কথা প্রচার করা হয়। বান্দরবানের লামা এলাকায়ও তাদের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের আর্থিক দিকটি অনুসন্ধানের আওতায় আসার বিষয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন কার্যক্রমে অনুদান, দান, যাকাত ও অন্যান্য আর্থিক সহায়তা সংগ্রহের ব্যবস্থা রয়েছে। এসব অর্থ কোথা থেকে আসছে, কীভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছে, কোন কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সম্পর্ক কী—এসব বিষয় আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে গুরুত্ব পেতে পারে।
কোয়ান্টাম মেথডের নিজস্ব প্রচারসামগ্রীতে প্রতিষ্ঠানটির সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডের বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে। রক্তদান কর্মসূচি, এতিম শিশুদের দায়িত্ব গ্রহণ, চিকিৎসাসেবা, প্রবীণসেবা এবং বিভিন্ন দাতব্য উদ্যোগ পরিচালনার তথ্যও সেখানে পাওয়া যায়। একই সঙ্গে বান্দরবানের লামা এলাকায় কোয়ান্টামম নামে একটি কেন্দ্র পরিচালনার তথ্যও প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশ্য কার্যক্রমে রয়েছে।
তবে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের অভিযোগ ও বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে বান্দরবানের লামা এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জমি নিয়ে বিরোধ এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রভাব বিস্তার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কোনোটি আদালত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা পৃথকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। ফলে অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে না দেখে তদন্তের আওতায় থাকা বিষয় হিসেবে দেখা জরুরি।
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সাংবাদিক জুলকার নাঈন সায়ের সামীর একটি দীর্ঘ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লেখাকে ঘিরেও কোয়ান্টাম মেথড নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। ওই লেখায় কোয়ান্টামের প্রতিষ্ঠাতা ও ‘গুরুজী’ হিসেবে পরিচিত শহীদ আল বোখারীকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হয়েছে। বিশেষ করে বান্দরবানের ভূমি ও প্রতিষ্ঠানটির কর্মকাণ্ড নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সরকারি নথি, ভূমির মালিকানা দলিল, সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক রেকর্ড এবং ভুক্তভোগী বা অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
এখানেই বর্তমান অনুসন্ধানের গুরুত্ব। একটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক, মানবিক ও আত্মউন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করলেই তার আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না। একইভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই সেটিকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও সমীচীন নয়। বরং অর্থের উৎস, লেনদেনের ধরন, সম্পদ অর্জনের প্রক্রিয়া, অনুদানের ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক স্বার্থ—সবকিছু নথিপত্রের ভিত্তিতে যাচাই করাই হবে প্রকৃত অনুসন্ধান।
বিশেষ করে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের ব্যাংকিং লেনদেনের তথ্য চাওয়ার বিষয়টি সামনে আসায় প্রতিষ্ঠানটির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এখন তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি অর্থের প্রবাহ, অনুদান ও দানের পরিমাণ, অর্থ উত্তোলন ও স্থানান্তরের ধরন এবং ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্কের তথ্য বিশ্লেষণ করলে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক কাঠামো সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।
অন্যদিকে কোয়ান্টাম মেথডের সামাজিক কার্যক্রমের ব্যাপ্তিও কম নয়। তাদের প্রকাশ্য কার্যক্রমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কেন্দ্র পরিচালনা, নিয়মিত ধ্যানচর্চা ও প্রশিক্ষণ, রক্তদান এবং মানবিক সহায়তার বিভিন্ন উদ্যোগের তথ্য রয়েছে। ফলে অনুসন্ধানে একদিকে যেমন অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির বৈধ ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম যাতে অযথা প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, সেটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
সব মিলিয়ে কোয়ান্টাম মেথডকে ঘিরে বর্তমান অনুসন্ধান কেবল একটি ধ্যানচর্চা বা আত্মউন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম যাচাইয়ের বিষয় নয়; এর সঙ্গে আর্থিক স্বচ্ছতা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, দাতব্য অর্থের ব্যবহার এবং বান্দরবানে ভূমি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মতো একাধিক প্রশ্ন জড়িয়ে রয়েছে। সরকারি সংস্থাগুলোর অনুসন্ধানে যদি ব্যাংকিং লেনদেন, সম্পদ অর্জন এবং অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ উঠে আসে, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে এতদিনের বিতর্ক নতুন মাত্রা পেতে পারে। আর অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ না মিললে সেটিও স্পষ্ট হওয়া জরুরি। ফলে এখন মূল অপেক্ষা তদন্তের ফলাফল ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের ওপর।

