loader image
শিরোনাম

৪৯ বছরে বিএনপি: ইতিহাস, সংগ্রাম ও নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা

জিয়াউর রহমানের হাত ধরে প্রতিষ্ঠা, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিস্তার, দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রতিকূলতা পেরিয়ে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন; এখন জনগণের প্রত্যাশা পূরণের কঠিন পরীক্ষা

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন আজ। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ৪৯ বছরে পা দিয়েছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত দলটি গত প্রায় পাঁচ দশকে দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কখনো রাষ্ট্রক্ষমতায়, কখনো বিরোধী দলের আসনে, আবার কখনো রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে দলটির দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা তৈরি করেছে নানা অধ্যায়।

এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিএনপির জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ ১৭ বছরের নানা চড়াই-উতরাই, রাজনৈতিক আন্দোলন, মামলা, কারাবন্দিত্ব ও সাংগঠনিক প্রতিকূলতা পেরিয়ে দলটি আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে। ফলে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই সময়ে বিএনপির সামনে শুধু অতীতের গৌরব স্মরণ করার বিষয় নয়, বরং ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে কীভাবে পরিচালনা করবে, সেটিই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বিএনপির যাত্রা

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠা করেন। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার ও জাতীয় ঐক্যের ধারণাকে সামনে রেখে দলটির রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়।

প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ের মধ্যেই বিএনপি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দলটি কঠিন সময়ের মুখোমুখি হলেও পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি নতুন সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির উত্থান

বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার অধ্যায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর নেতৃত্বে দলটি একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর ১৯৯৬ সালে স্বল্প সময়ের জন্য এবং ২০০১ সালে আবারও সরকার গঠন করে বিএনপি।

তিন দফায় দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা খালেদা জিয়া দীর্ঘ সময় বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে দলটি যেমন রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে, তেমনি বিরোধী রাজনীতিতেও বড় আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে।

দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রতিকূলতার রাজনীতি

২০০৬ সালের পর বিএনপির রাজনৈতিক পথ সহজ ছিল না। দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থাকা, রাজনৈতিক মামলা, গ্রেপ্তার, আন্দোলন, সংঘাত এবং সাংগঠনিক নানা সংকট দলটির জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়।

বিশেষ করে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ও শারীরিক অনুপস্থিতি বিএনপির নেতৃত্ব কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আনে। দলের ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্বে তারেক রহমানের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দীর্ঘ প্রতিকূলতার মধ্যেও দলটির সাংগঠনিক কাঠামো ও রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা অব্যাহত থাকে।

শেষ পর্যন্ত পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে এসেছে। ফলে দীর্ঘ সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের পর এখন দলটির সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করা।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ভাষণে যে বার্তা

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলের চেয়ারপার্সন তাঁর বক্তব্যে বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস, শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শ এবং খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের কথা স্মরণ করেছেন। একই সঙ্গে জনগণের আস্থা ও ভালোবাসার প্রতিদান দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

দলের পক্ষ থেকে জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রত্যয়ের কথা বলা হয়েছে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিশ্রুতি দেওয়া আর বাস্তবায়ন করা এক বিষয় নয়। ক্ষমতায় আসার পর জনগণের কাছে সরকারের কার্যকারিতা দৃশ্যমান হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

জনগণের প্রত্যাশা কোথায়?

বর্তমান সময়ে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশার জায়গা অর্থনীতি। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা, ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা এবং মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার সময় বিএনপি জনগণের নানা প্রত্যাশা ও অসন্তোষকে রাজনৈতিকভাবে তুলে ধরেছে। এখন সেই প্রত্যাশাগুলো পূরণের দায়িত্বও তাদের ওপরই বর্তেছে।

মানুষ চায় বাজারে স্বস্তি। চায় কর্মসংস্থান। চায় ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থিতিশীলতা। চায় ব্যাংক ও আর্থিক খাতে আস্থা। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্ম চায় যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চয়তা।

দুর্নীতি ও জবাবদিহির প্রশ্ন

বিএনপির সামনে আরেকটি বড় পরীক্ষা দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা।

বিশ্লেষকদের মতে, একটি সরকার কতটা সফল তা শুধু বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে বিচার করা যায় না। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হচ্ছে, দুর্নীতি কতটা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে, প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে এবং সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রীয় সেবা কতটা সহজে পাচ্ছে—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিএনপি যদি সত্যিকার অর্থে জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে দলীয় প্রভাবের বাইরে প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন

দেশের মানুষ এখন রাজনৈতিক সংঘাতের পরিবর্তে স্থিতিশীলতা চায়। তারা এমন একটি পরিবেশ চায় যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু সহিংসতা থাকবে না; বিরোধিতা থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দুর্বলতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা। বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, আইনের সমান প্রয়োগ এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারলে দলটি দীর্ঘমেয়াদি জনসমর্থনের ভিত্তি আরও শক্ত করতে পারবে।

ইতিহাসের গৌরব, ভবিষ্যতের দায়

বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাসে রয়েছে সাফল্য, ব্যর্থতা, ক্ষমতা, আন্দোলন, সংঘাত এবং নানা রাজনৈতিক বাঁকবদল। শহীদ জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দলটি বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘ প্রতিকূলতার পর নতুন নেতৃত্বের হাত ধরে আবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে।

কিন্তু জনগণের কাছে এখন অতীতের ইতিহাসের চেয়ে বর্তমানের বাস্তবতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

মানুষ জানতে চায়—দ্রব্যমূল্য কমবে কি না, কর্মসংস্থান বাড়বে কি না, দুর্নীতি কমবে কি না, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে কি না, বিনিয়োগ বাড়বে কি না এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিকার অর্থে জনগণের সেবায় নিয়োজিত হবে কি না।

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির সামনে এখন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সুযোগ। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সংগঠন এবং জনগণের প্রত্যাশাকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে দলটি যদি একটি কার্যকর, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে এই অধ্যায় তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

আর যদি জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, তাহলে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

৪৮ বছরের বিএনপির জন্য তাই এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু অতীত স্মরণের দিন নয়; এটি জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের নতুন অঙ্গীকারের দিন। ক্ষমতার মসনদে ফিরে আসা বিএনপির অর্জন, কিন্তু জনগণের আস্থা ধরে রাখা হবে তাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

Please follow and like us:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top