খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল, তিন মাসে বেড়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি
নিজস্ব প্রতিবেদক:
দীর্ঘদিন ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল করে রাখার যে সংস্কৃতি ছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসার পর এখন সামনে আসছে ঋণখেলাপির ভয়াবহ বাস্তবতা। বছরের পর বছর পুনঃতফসিল, ঋণ নবায়ন, ঋণের শ্রেণিকরণে ছাড় এবং নানা হিসাব-কৌশলের মাধ্যমে যে ঋণগুলোকে নিয়মিত দেখানো হয়েছিল, ব্যাংক খাতের সংস্কার প্রক্রিয়ায় সেগুলোর বড় একটি অংশ এখন শ্রেণিকৃত ঋণ হিসেবে উঠে আসছে। এর ফলে গত দুই বছরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কয়েক গুণ বেড়ে ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
বিশেষ করে গত কয়েক বছরে ব্যাংক খাতে বড় ধরনের ঋণ অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন ঋণের প্রকৃত মান যাচাই ও শ্রেণিকরণের ক্ষেত্রে কঠোর হয়েছে, তখন এতদিনের লুকিয়ে থাকা ঝুঁকিগুলো একের পর এক প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। এর বড় উদাহরণ ইসলামী ধারার কয়েকটি ব্যাংক। এসব ব্যাংকে এস আলম গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে বিপুল পরিমাণ ঋণ বিতরণ এবং সেই ঋণের বড় অংশের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যালোচনায় সেগুলো শ্রেণিকৃত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যানে।
ফলে বর্তমানের ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণকে শুধু নতুন করে ঋণখেলাপি হওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। এর একটি বড় অংশ হলো অতীতে বিতরণ করা ঋণের প্রকৃত অবস্থা এখন হিসাবের খাতায় প্রতিফলিত হওয়া। অর্থাৎ খেলাপি ঋণের যে পরিমাণ এখন প্রকাশ্যে এসেছে, তার মধ্যে নতুন করে খেলাপি হওয়া ঋণের পাশাপাশি দীর্ঘদিন গোপন বা কৃত্রিমভাবে নিয়মিত রাখা ঋণেরও বড় প্রভাব রয়েছে।
গত জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা। মার্চ শেষে যা ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ এখন খেলাপি।
তবে সাম্প্রতিক এই পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এর পেছনের কয়েক বছরের ঘটনাপ্রবাহও বিবেচনায় নিতে হবে। গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। মার্চ শেষে তা বেড়েছিল ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। এর আগে ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় তিন গুণ হয়েছে
।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, মূলত ঋণের সঙ্গে সুদ যুক্ত হওয়ার কারণেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। খেলাপি ঋণ কমাতে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সামনে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে আসবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কেন হঠাৎ এত খেলাপি ঋণ:
ব্যাংকার ও খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, খেলাপি ঋণের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পেছনে দুটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ব্যাংকগুলোতে ঋণের প্রকৃত মান প্রকাশের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় কঠোরতা এসেছে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনার কারণে যেসব ঋণ আদায়যোগ্য ছিল না, সেগুলো এখন শ্রেণিকরণের আওতায় আসছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের সময়ে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রতারণা ও দুর্নীতির অভিযোগ ব্যাপক আকার ধারণ করে। প্রভাবশালী গ্রাহকদের ঋণ সুবিধা দেওয়া, ঋণ পরিশোধ না করেও পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের মাধ্যমে তা নিয়মিত রাখার প্রবণতা এবং দুর্বল তদারকির কারণে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত ঝুঁকি দীর্ঘদিন আড়ালে ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা যাচাইয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর অবস্থান নেয়। বিশেষ করে দুর্বল ব্যাংকগুলোর ঋণপোর্টফোলিও পর্যালোচনা, বড় ঋণগ্রহীতাদের ঋণের মান যাচাই এবং অনিয়মিত ঋণকে যথাযথভাবে শ্রেণিকরণের ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যায়।
ইসলামী ব্যাংকগুলোতে অনিয়মের বড় প্রভাব:
খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ইসলামী ধারার কয়েকটি ব্যাংকের পরিস্থিতি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন এসব ব্যাংকের একটি অংশে বড় গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল ঋণ বিতরণের অভিযোগ ছিল। বিশেষ করে এস আলম গ্রুপ ও সংশ্লিষ্টদের ঋণ নিয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর এসব ঋণের প্রকৃত অবস্থা পর্যালোচনা শুরু হয়।
পর্যালোচনায় যেসব ঋণের পরিশোধ সক্ষমতা ও যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন পাওয়া গেছে, সেগুলোর একটি বড় অংশ শ্রেণিকৃত হওয়ার ফলে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ দ্রুত বেড়েছে। পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত হয়ে বর্তমানে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ৮০ শতাংশের বেশি—যা ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের অনিয়মের গভীরতা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা দেয়।
দেড় দশকে খেলাপি ঋণের ভয়াবহ বিস্তার:
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা।
এরপর ব্যাংক খাতের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশের প্রক্রিয়া শুরু হলে খেলাপি ঋণের হিসাব দ্রুত পাল্টাতে থাকে। ফলে বর্তমান ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণের বড় অংশকে শুধু সাম্প্রতিক ঋণখেলাপির ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অস্বচ্ছ ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং ঋণের প্রকৃত মান গোপন রাখার প্রবণতার জমে থাকা দায় এখন ব্যাংকগুলোর আর্থিক হিসাবে দৃশ্যমান হয়েছে।
পুনঃতফসিল কি সমাধান, নাকি সাময়িক স্বস্তি:
খেলাপি ঋণের চাপ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ ছাড়ে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, মূলত ঋণের সঙ্গে সুদ যুক্ত হওয়ার কারণেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে। পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়ায় সামনে খেলাপি ঋণ কমে আসবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
তবে ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, পুনঃতফসিলের মাধ্যমে পরিসংখ্যানগতভাবে খেলাপি ঋণ কমানো সম্ভব হলেও এতে মূল সমস্যা সমাধান হবে না, যদি ঋণের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও আদায়ের বাস্তব সম্ভাবনা যাচাই না করা হয়। প্রকৃত সমাধানের জন্য প্রয়োজন ঋণ আদায় বাড়ানো, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, ঋণ বিতরণে যথাযথ যাচাই এবং ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসন নিশ্চিত করা।
কারণ, এতদিন যে খেলাপি ঋণ লুকিয়ে রাখা হয়েছিল তা প্রকাশ্যে আসা ব্যাংক খাতের জন্য এক অর্থে সংকটের প্রকাশ হলেও অন্য অর্থে এটি স্বচ্ছতার দিকে ফেরার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এখন চ্যালেঞ্জ হলো—এই প্রকাশিত সংকটকে আবারও পুনঃতফসিল কিংবা হিসাবের কৌশলে আড়াল না করে বাস্তব ঋণ আদায় ও ব্যাংক খাতের কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে সমাধান করা।
