loader image
শিরোনাম

বিদেশি ঋণ ও গ্যারান্টিতে কড়াকড়ি, ২৫ শতাংশ নগদ জামানত বাধ্যতামূলক

বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনসংক্রান্ত যেমন ঋণ, ঋণসীমা, গ্যারান্টি ও বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকলিত পরিপত্র জারি করেছে

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিদেশি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্যারান্টির বিপরীতে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন করে কড়াকড়ি আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন এ ধরনের ঋণ দেওয়ার আগে গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা, ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য, জামানত এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের গ্যারান্টির আইনগত কার্যকারিতা যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশি ঋণের দায় পরিশোধের নিশ্চয়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জামানতের অন্তত ২৫ শতাংশ নগদ অর্থ বা সহজে নগদায়নযোগ্য ব্যাংক আমানত রাখতে হবে।

বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ-১ বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনসংক্রান্ত যেমন ঋণ, ঋণসীমা, গ্যারান্টি ও বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সংকলিত পরিপত্র জারি করেছে। নতুন নির্দেশনায় বিদেশি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দেওয়া ব্যাংক গ্যারান্টি কিংবা ঋণ পরিশোধের নিশ্চয়তার বিপরীতে দেশে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানকে স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে গ্যারান্টি হতে হবে শর্তহীন, অপরিবর্তনীয় এবং প্রথম দাবিতে পরিশোধযোগ্য। একই সঙ্গে গ্যারান্টিদাতা বিদেশি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণমান গ্রহণযোগ্য পর্যায়ের হতে হবে।

নতুন নিয়মে শুধু বিদেশি গ্যারান্টি থাকলেই ঋণ দেওয়ার সুযোগ থাকছে না। ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা ও ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য যথাযথভাবে যাচাই করতে হবে। এ জন্য নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী, নগদ অর্থের প্রবাহ এবং অন্যান্য আর্থিক সূচক বিশ্লেষণ করতে হবে। বিদেশি গ্যারান্টির আইনগত বৈধতা, বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে গ্যারান্টি কার্যকর করার সুযোগও যাচাই করতে হবে।

বিদেশি ঋণের দায়ে ব্যাংকের ঝুঁকি কমাতে পদক্ষেপ

বিদেশ থেকে নেওয়া ঋণের বিপরীতে দেশের কোনো ব্যাংক ঋণ পরিশোধের নিশ্চয়তা দিলে ঋণগ্রহীতা ব্যর্থ হলে সেই দায় শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের ওপর পড়তে পারে। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক এ ধরনের দায়ের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

নির্দেশনা অনুযায়ী, বিদেশি ঋণের বিপরীতে ব্যাংক গ্যারান্টি বা ঋণ পরিশোধের নিশ্চয়তা দিতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিতে হবে। আবেদনের সঙ্গে পর্যাপ্ত জামানতের প্রমাণ দিতে হবে। এ জামানতের অন্তত ২৫ শতাংশ নগদ অর্থ অথবা সহজে নগদায়নযোগ্য ব্যাংক আমানত হিসেবে রাখতে হবে।

এর ফলে বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে কোনো গ্রাহক পরিশোধে ব্যর্থ হলে ব্যাংকের নিজস্ব অর্থে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের দায় বহনের ঝুঁকি কিছুটা কমবে বলে মনে করা হচ্ছে।

রপ্তানিকারকদের গ্যারান্টি দেওয়ার সুযোগ

বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তির ক্ষেত্রে দেশের রপ্তানিকারকদের জন্য ব্যাংক গ্যারান্টি দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে। রপ্তানি চুক্তি, কার্যাদেশ, ঋণপত্র বা অগ্রিম অর্থ প্রদানের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় গ্যারান্টি দেওয়া যাবে।

তবে এ ক্ষেত্রে গ্রাহকের যথাযথ যাচাই এবং প্রকৃত ব্যবসায়িক লেনদেন নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংককে একই সঙ্গে গ্রাহকের বিদ্যমান ঋণ, আর্থিক সক্ষমতা ও সামগ্রিক ঝুঁকি বিবেচনা করতে হবে।

বিদেশি দরপত্রে অংশ নেওয়া বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও ব্যাংক গ্যারান্টি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে কাজ পাওয়া বিদেশি প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় অংশীদার, প্রতিনিধি বা এজেন্টের অনুকূলে প্রয়োজনীয় গ্যারান্টি দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রতিষ্ঠানেও ঋণের সুযোগ

বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল ও অন্যান্য বিশেষায়িত অঞ্চলের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণের সুযোগ স্পষ্ট করা হয়েছে।

বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক মুদ্রার ঋণ নিতে পারবে। তবে ঋণের অর্থ অনুমোদিত ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে আনতে হবে এবং নির্ধারিত উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করতে হবে।

যৌথ মালিকানার প্রতিষ্ঠানগুলোও নির্দিষ্ট শর্তে বিদেশি মুদ্রার ঋণের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ নিতে পারবে। এসব ঋণ পরিশোধ করতে হবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈদেশিক মুদ্রা আয় থেকে।

বিশেষায়িত অঞ্চলের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক। অনুমোদনের সময় প্রকল্পের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, পণ্যের বাজার চাহিদা, উৎপাদন ব্যয় এবং উদ্যোক্তার বিদ্যমান ঋণের পরিমাণ বিবেচনা করা হবে।

বিদেশি ঋণের ব্যবহার ও পরিশোধের তথ্য জানাতে হবে

বিদেশি ঋণের অর্থ কোথায় ব্যবহার করা হয়েছে এবং কীভাবে পরিশোধ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে নিয়মিত তথ্য দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট অনুমোদিত ব্যাংককে প্রতি তিন মাস শেষে ১৫ দিনের মধ্যে বিদেশি ঋণের পরিমাণ, ব্যবহার, কিস্তি, পরিশোধ, বকেয়া ও অন্যান্য তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠাতে হবে।

এতে বিদেশ থেকে নেওয়া ঋণের অর্থের ব্যবহার ও পরিশোধের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি আরও বাড়বে।

প্রবাসীদের আবাসন ঋণেও সুবিধা

নতুন নির্দেশনায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশে বাড়ি নির্মাণ বা কেনার জন্য স্থানীয় মুদ্রায় আবাসন ঋণের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ঋণ ও নিজস্ব অর্থের অনুপাত সর্বোচ্চ ৭৫:২৫ হতে পারবে। অর্থাৎ সম্পত্তির মূল্যের সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ এবং অন্তত ২৫ শতাংশ নিজস্ব অর্থ থাকতে হবে।

নিয়মিত বৈধ পথে দেশে অর্থ পাঠান এমন প্রবাসীরা প্রয়োজন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন। এসব ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে বিদেশ থেকে পাঠানো অর্থের মাধ্যমে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিদেশি ঋণেও শর্ত

বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও নির্দিষ্ট শর্তে বিদেশ থেকে ঋণ নিতে পারবে। এ ঋণের মেয়াদ গ্রেস পিরিয়ডসহ কমপক্ষে পাঁচ বছর হতে হবে।

বিদেশ থেকে নেওয়া বৈদেশিক মুদ্রার ঋণ জামানত হিসেবে ব্যবহার করে দেশের ব্যাংক থেকে স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ নেওয়া যাবে। তবে এ অর্থ কেবল উৎপাদনশীল শিল্প ও আবাসন ছাড়া অবকাঠামো খাতে ঋণ দেওয়ার কাজে ব্যবহার করতে হবে।

Please follow and like us:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top