নিজস্ব প্রতিবেদক:
ডলার ও টাকার বিনিময় বাজারে সাম্প্রতিক সময়ে অস্থিরতা দেখা দিলেও এর ধরন আগের বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের সরবরাহ তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক থাকলেও নগদ ডলারের খোলা বাজার বা কার্ব মার্কেটে সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বাজারে ডলারের দামের ব্যবধান বাড়ছে। এই বৈপরীত্যই বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ বিকেল ৫টা পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে প্রতি ডলারের লেনদেনভিত্তিক গড় দর ছিল ১২২ টাকা ৭৯ পয়সা। এর আগের দিন ছিল ১২৩ টাকা ১ পয়সা। অর্থাৎ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের দর বরং কিছুটা কমেছে।
অন্যদিকে নগদ ডলারের কার্ব বাজারে চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২৪ আগস্ট অনুমোদিত মানি চেঞ্জারদের জন্য ডলার বিক্রির সর্বোচ্চ দর ১২৬ টাকা ৫০ পয়সা এবং কেনার দর ১২৫ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর আগে কার্ব বাজারে নগদ ডলারের দাম ১২৮ টাকা পর্যন্ত উঠে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়। অর্থাৎ ব্যাংকিং বাজারের তুলনায় নগদ ডলারের বাজারে প্রায় ৩ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত দর দেখা গেছে।
বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো ব্যাংকিং চ্যানেল ও নগদ বাজারের চাহিদা-জোগানের পার্থক্য। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয় ও অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের মাধ্যমে ডলার আসছে। ফলে ব্যাংকগুলোর কাছে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। এমনকি সরবরাহ বৃদ্ধির কারণে দর কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক ১ সেপ্টেম্বর প্রায় তিন মাস পর আবার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৫ কোটি ডলার কিনেছে। ওই ডলার কেনা হয়েছে ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা দরে।
অর্থাৎ একদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে মজুত বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে নগদ ডলারের জন্য মানুষকে বেশি দাম দিতে হচ্ছে। এটি ইঙ্গিত করে যে বর্তমান সমস্যাটি মূলত ডলারের মোট সরবরাহের চেয়ে নগদ ডলারের সরবরাহ ও বণ্টনসংক্রান্ত।
এখানে রেমিট্যান্স প্রবাহের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আগস্টে দেশে প্রায় ২৯৭ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি। জুলাইয়েও রেমিট্যান্স ছিল প্রায় ২৮৬ কোটি ডলার। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার আনুষ্ঠানিক প্রবাহে বড় কোনো সংকট দেখা যাচ্ছে না।
তবে রেমিট্যান্স বাড়া মানেই নগদ ডলারের সরবরাহ বাড়া নয়। রেমিট্যান্সের বড় অংশ ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে আসে। ব্যাংকে জমা হওয়া ডলার আমদানি বিল পরিশোধ, বৈদেশিক দায় মেটানো কিংবা আন্তঃব্যাংক বাজারে লেনদেনে ব্যবহৃত হয়। ফলে ব্যাংকিং বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়লেও ভ্রমণ, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য ব্যক্তিগত প্রয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় হাতে হাতে নগদ ডলারের বাজারে একই মাত্রায় সরবরাহ বাড়ে না।
সম্প্রতি ভারতের চিকিৎসা ও ভ্রমণ ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালু হওয়ায় নগদ ডলারের চাহিদা বেড়েছে বলে মানি চেঞ্জাররা জানিয়েছেন। বিশেষ করে ভারতমুখী চিকিৎসা ও ভ্রমণ বাড়লে যাত্রীদের নগদ বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হয়। এর বিপরীতে প্রবাসীদের হাতে নগদ ডলার নিয়ে দেশে আসার প্রবাহ তুলনামূলক কম থাকায় বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।
সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থানের দিক থেকেও পরিস্থিতি কয়েক বছর আগের তুলনায় অনেক ভালো। আগস্টে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ৩৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। একই সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহও শক্তিশালী রয়েছে। ফলে বর্তমান নগদ ডলার সংকটকে ২০২২-২৩ সালের মতো সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রা সংকট হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
বরং বর্তমান পরিস্থিতিকে বলা যায়, নগদ ডলারের সংকট রয়েছে, কিন্তু ব্যাংকিং বাজারে ডলারের সরবরাহ স্বস্তিদায়ক। এই দুই বাস্তবতা একই সময়ে বিদ্যমান থাকায় বাজারে অস্বাভাবিক দামের পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
কার্ব মার্কেট ও ব্যাংকিং বাজারের দামের ব্যবধান দীর্ঘস্থায়ী হলে কয়েকটি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যাদের তাৎক্ষণিক নগদ ডলার প্রয়োজন, তারা ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে অনানুষ্ঠানিক বাজারের দিকে ঝুঁকতে পারেন। একই সঙ্গে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রেও আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বাজারের দামের ব্যবধান প্রভাব ফেলতে পারে। অতীতে এমন ব্যবধান বাড়লে রেমিট্যান্স প্রবাহে চাপ তৈরির নজির রয়েছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় পার্থক্য হলো আনুষ্ঠানিক রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ডলারের তারল্যও তুলনামূলক ভালো। ফলে কার্ব বাজারের সংকট যদি মূলত নগদ ডলারের চাহিদাজনিত হয়, তাহলে এটি সামাল দেওয়া আগের সার্বিক বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের তুলনায় সহজ হওয়ার কথা।
আগামী দিনে পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করবে নগদ ডলারের সরবরাহ কত দ্রুত স্বাভাবিক হয় এবং ভ্রমণ ও চিকিৎসাজনিত চাহিদা কোন পর্যায়ে থাকে তার ওপর। ব্যাংকিং বাজারে ডলারের সরবরাহ অব্যাহত থাকলে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজন অনুযায়ী বাজার থেকে ডলার কিনে অতিরিক্ত সরবরাহ শোষণ করলে আন্তঃব্যাংক দর তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকতে পারে।
অন্যদিকে নগদ ডলারের সরবরাহ না বাড়লে ব্যাংকিং বাজারে ডলারের দর কমলেও কার্ব মার্কেটে দাম বেশি থাকার প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। তাই বর্তমানে নীতিনির্ধারকদের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ সামগ্রিক ডলার সংকট মোকাবিলা নয়; বরং আনুষ্ঠানিক ও নগদ বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের মধ্যে তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক ব্যবধান কমিয়ে বাজারকে স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল করা।
