ক্ষুদ্র ঋণে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের নতুন দিগন্ত
নিজস্ব প্রতিবেদক:
জরুরি ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ‘ই-পেমেন্ট ক্রেডিট’ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ৬ সেপ্টেম্বর জারি করা ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১-এর সার্কুলার নং-১৭-এর মাধ্যমে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোকে এই সুবিধা চালুর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নতুন এই ব্যবস্থায় গ্রাহককে নগদ টাকা দেওয়ার পরিবর্তে অনুমোদিত ডিজিটাল মাধ্যমে সরাসরি নির্দিষ্ট সেবা বা বিল পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হবে। ফলে ক্ষুদ্র অঙ্কের স্বল্পমেয়াদি অর্থের প্রয়োজন মেটাতে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় একটি নতুন ডিজিটাল ঋণপণ্য যুক্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার বিশ্লেষণে দেখা যায়, দ্রুত বাড়তে থাকা ইন্টারনেট, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহারের ফলে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং ও অনলাইন আর্থিক লেনদেন দেশে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় গ্রাহকের সাময়িক তারল্য সংকট মোকাবিলা, দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় ব্যয় যথাসময়ে পরিশোধ এবং ডিজিটাল লেনদেনের দায়িত্বশীল ব্যবহার উৎসাহিত করতেই নতুন এই ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই ঋণের আওতায় ৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থ ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। তবে এটি প্রচলিত অর্থে হাতে পাওয়া নগদ ঋণ নয়। বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ বিভিন্ন পরিষেবা বিল, মোবাইল রিচার্জ, শিক্ষা ও চিকিৎসা-সংক্রান্ত ব্যয়, টোল ও টিকিটের খরচ, করসহ বিভিন্ন সরকারি ফি, আমানতের কিস্তি, বিমার প্রিমিয়াম এবং বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত অন্যান্য ব্যয় পরিশোধে এই ঋণ ব্যবহার করা যাবে। অর্থাৎ গ্রাহকের প্রয়োজনীয় ব্যয়টি সরাসরি পরিশোধ করাই হবে এই ঋণের মূল উদ্দেশ্য।
নতুন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, ঋণের অর্থ গ্রাহক নগদে রূপান্তর করতে পারবেন না। এমনকি নিজের ওয়ালেটে অর্থ যোগ করা বা অন্য কোনো হিসাবে স্থানান্তরের সুযোগও থাকবে না। নির্ধারিত সেবা প্রদানকারীর অনুকূলে অনুমোদিত ডিজিটাল চ্যানেলের মাধ্যমে সরাসরি অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এর ফলে ঋণের অর্থ অন্য কাজে ব্যবহার বা নগদ অর্থে পরিণত করার ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে ঋণের পুরো কার্যক্রম ব্যাংকের অনুমোদিত অ্যাপের মাধ্যমে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করতে হবে।
ঋণের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে সাত, ১৫ ও ৩০ দিন। ঋণের পরিমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সর্বোচ্চ সেবা মাশুলও নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ৫০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে সাত দিনের জন্য সর্বোচ্চ তিন টাকা, ১৫ দিনের জন্য চার টাকা এবং ৩০ দিনের জন্য ছয় টাকা মাশুল নেওয়া যাবে। অন্যদিকে ৭ হাজার ১ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে সাত, ১৫ ও ৩০ দিনের জন্য সর্বোচ্চ মাশুল হবে যথাক্রমে ৩৫, ৭০ ও ১৩০ টাকা। ফলে ‘সুদবিহীন’ হলেও গ্রাহকের জন্য এই ঋণ সম্পূর্ণ খরচমুক্ত নয়; নির্ধারিত সেবা মাশুলই হবে ব্যাংকের আয়ের প্রধান উপাদান।
সার্কুলারে গ্রাহকের স্বার্থ সুরক্ষায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান রাখা হয়েছে। ঋণের মূল অর্থ ও প্রযোজ্য মাশুল যথাক্রমে ঋণ বিতরণের পর অষ্টম, ষোড়শ অথবা ৩১তম দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। তবে গ্রাহক নির্ধারিত সময়ের আগেই ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে নির্ধারিত সেবা মাশুলের বাইরে অতিরিক্ত সুদ, আগাম পরিশোধ মাশুল, আগাম নিষ্পত্তি মাশুল বা এ ধরনের অন্য কোনো চার্জ নেওয়া যাবে না।
তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ না করলে অতিরিক্ত সময়ের জন্য দৈনিক ভিত্তিতে জরিমানা বা মাশুল আদায় করা যাবে। এ ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ব্যাংক সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে, যাতে বিলম্বের কারণে গ্রাহকের ওপর অস্বাভাবিক আর্থিক চাপ তৈরি না হয়।
নতুন এই ঋণব্যবস্থায় ঋণঝুঁকি নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঋণ অনুমোদনের আগে গ্রাহকের ঋণতথ্য যাচাইয়ের জন্য সিআইবি অনুসন্ধানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তবে এ ব্যবস্থার API-ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় সিআইবি ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গভাবে ২৪ ঘণ্টা চালু না হওয়া পর্যন্ত কিছু ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক অনুসন্ধানের বাধ্যবাধকতা শিথিল থাকবে। কিন্তু ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের পর দ্রুত সিআইবি অনুসন্ধান করে তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। খেলাপি ঋণগ্রহীতা তথ্য গোপন করে নতুন ঋণ নিলে সিআইবি অনুসন্ধানে তা ধরা পড়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে।
এখানে ব্যাংকগুলোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ঝুঁকিভিত্তিক ঋণসীমা নির্ধারণ। সার্কুলার অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদিত নীতিমালার আওতায় ব্যাংককে নিজস্ব ডিজিটাল ঋণ স্কোরিং ব্যবস্থা ব্যবহার করে গ্রাহকের ঝুঁকি বিবেচনায় ঋণসীমা নির্ধারণ করতে হবে। এর অর্থ হলো, ১০ হাজার টাকা সর্বোচ্চ সীমা হলেও প্রত্যেক গ্রাহক স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১০ হাজার টাকা পাওয়ার অধিকারী হবেন না। গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা, পূর্ববর্তী ঋণ আচরণ ও ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রকৃত সীমা নির্ধারিত হবে।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বেশ কিছু বাধ্যবাধকতা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গ্রাহকের নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে ওটিপি, দ্বিস্তরীয় পরিচয় যাচাই, বহুপদক্ষেপের পরিচয় যাচাই অথবা ব্যাংক অনুমোদিত অন্য কোনো নিরাপদ পদ্ধতিতে গ্রাহকের পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানকারী, পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী, পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটরসহ তৃতীয় পক্ষের প্রযুক্তি সেবাও নির্ধারিত বিধিবিধান মেনে ব্যবহার করা যাবে।
গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষার বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। ক্লাউড কম্পিউটিং ও সাইবার নিরাপত্তাসংক্রান্ত নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে এবং গ্রাহক ও ঋণসংক্রান্ত তথ্য বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমারেখার অভ্যন্তরে অবস্থিত তথ্যভান্ডারে সংরক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধসংক্রান্ত বিদ্যমান নীতিমালাও অনুসরণ করতে হবে।
তবে এই ব্যবস্থা সরাসরি বাণিজ্যিকভাবে চালুর সুযোগ দেওয়া হয়নি। সার্কুলারে বলা হয়েছে, বাণিজ্যিকভাবে চালুর আগে অন্তত ছয় মাস পরীক্ষামূলকভাবে বা পাইলট ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। পাইলট কার্যক্রমের ফলাফল মূল্যায়ন এবং ইতিবাচক প্রতিবেদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনে চূড়ান্ত পণ্য নির্দেশিকা তৈরি করে বাণিজ্যিকভাবে চালু করা যাবে। বাণিজ্যিকভাবে চালুর ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে পাইলটের মূল্যায়ন ও অনুমোদিত পণ্য নির্দেশিকা বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১-কে জানাতে হবে।
সার্বিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন উদ্যোগকে ক্ষুদ্র ঋণের ডিজিটাল রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায়। বিশেষ করে অল্প অঙ্কের অর্থের জন্য শাখায় গিয়ে আবেদন, কাগজপত্র ও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পরিবর্তে মোবাইলভিত্তিক তাৎক্ষণিক সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা বা সীমিত ব্যাংকিং সুবিধা পাওয়া গ্রাহকেরাও উপকৃত হতে পারেন। একই সঙ্গে ইউটিলিটি বিল, চিকিৎসা, শিক্ষা, মোবাইল রিচার্জ কিংবা সরকারি ফি পরিশোধের মতো দৈনন্দিন প্রয়োজনের সঙ্গে ঋণকে সরাসরি যুক্ত করায় অর্থের অপব্যবহারের সুযোগও তুলনামূলকভাবে কম থাকবে।
তবে উদ্যোগটির বড় চ্যালেঞ্জ হবে ঋণখেলাপি নিয়ন্ত্রণ, গ্রাহকের তথ্যের নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণা প্রতিরোধ। মাত্র ৫০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ হওয়ায় প্রতিটি ঋণের অঙ্ক ছোট হলেও বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের মধ্যে এ ধরনের ঋণ ছড়িয়ে পড়লে ব্যাংকের সামগ্রিক ঝুঁকি বড় হয়ে উঠতে পারে। সে কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক পাইলট কার্যক্রম, ঝুঁকিভিত্তিক ঋণসীমা, সিআইবি যাচাই, পরিচয় নিশ্চিতকরণ, তথ্য সুরক্ষা ও নিয়মিত প্রতিবেদন দেওয়ার মতো একাধিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা রেখেছে।
সব মিলিয়ে ‘ই-পেমেন্ট ক্রেডিট’কে শুধু সুদবিহীন ক্ষুদ্র ঋণ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এটি মূলত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ছোট অঙ্কের ঋণকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসার একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ। সফল হলে এটি একদিকে ক্ষুদ্র ও জরুরি ব্যয়ের জন্য আনুষ্ঠানিক ঋণের সুযোগ বাড়াতে পারে, অন্যদিকে ব্যাংকের ঋণ বিতরণ, গ্রাহক মূল্যায়ন ও ডিজিটাল সেবার কাঠামোকেও আরও প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সার্কুলারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক তাই ঋণের পরিমাণ নয়; বরং ক্ষুদ্র ঋণকে কীভাবে নিরাপদ, দ্রুত, নিয়ন্ত্রিত এবং পুরোপুরি ডিজিটাল ব্যবস্থার মধ্যে আনা যায়, তার একটি কাঠামো তৈরি করা।
