loader image
শিরোনাম

বিদেশ ভ্রমণে বছরে খরচের সীমা বেড়ে ১৮ হাজার ডলার

এক ধাক্কায় বছরে খরচ বাড়ল ৬ হাজার ডলার বা ৫০ শতাংশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিদেশ ভ্রমণে বাংলাদেশিদের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ বড় করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে একজন প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি নাগরিক বছরে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ভ্রমণ বাবদ ব্যবহার করতে পারবেন। এত দিন এ সীমা ছিল ১২ হাজার ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে না হলেও নতুন সিদ্ধান্তে বিদ্যমান ভ্রমণসীমা এক ধাক্কায় ৬ হাজার ডলার বা ৫০ শতাংশ বাড়ল। ৬ সেপ্টেম্বর জারি করা বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ-১-এর সার্কুলার নং-৩৩-এর মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, প্রকৃত ভ্রমণসংক্রান্ত বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন মেটানো এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণের পরিবর্তিত চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এ সীমা বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল লক্ষ্য হলো বৈধ ও প্রকৃত বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো। অনুমোদিত ডিলার বা এডি ব্যাংকগুলো এখন থেকে দেশে বসবাসকারী প্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি নাগরিককে একটি ক্যালেন্ডার বছরে সর্বোচ্চ ১৮ হাজার ডলার বা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ছাড় করতে পারবে।

তবে নতুন সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে একজন ভ্রমণকারী পুরো ১৮ হাজার ডলারই নগদ মার্কিন মুদ্রা হিসেবে হাতে নিতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক নগদ ডলারের ক্ষেত্রে আগের সীমাই বহাল রেখেছে। একজন ব্যক্তি তার প্রযোজ্য বার্ষিক ভ্রমণসীমার মধ্যে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত মার্কিন ডলার নোট হিসেবে নিতে পারবেন। বাকি বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন অনুমোদিত অন্যান্য মাধ্যমে মেটানো যাবে। ফলে নতুন সিদ্ধান্তে মূলত মোট বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সীমা বাড়ানো হয়েছে, নগদ ডলার বহনের সীমা নয়।

অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে অবশ্য কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। ১২ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য প্রাপ্তবয়স্কদের প্রাপ্য সীমার ৫০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ আগের মতোই থাকবে। অর্থাৎ প্রাপ্তবয়স্কদের সীমা ১৮ হাজার ডলার হওয়ায় ১২ বছরের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সীমা হবে সর্বোচ্চ ৯ হাজার ডলার।

এই সিদ্ধান্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক ভ্রমণসংক্রান্ত বৈদেশিক মুদ্রা ছাড়ের অন্যান্য বিদ্যমান নির্দেশনা অপরিবর্তিত রেখেছে। অর্থাৎ শুধু ভ্রমণসীমা বাড়ানো হয়েছে; বৈদেশিক মুদ্রা ছাড়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অন্যান্য নিয়ম ও শর্ত বহাল থাকবে। অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোকে নতুন নির্দেশনার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট গ্রাহকদের জানাতে বলা হয়েছে।

সার্কুলার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারে মানুষের বাস্তব প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দিয়েছে, অন্যদিকে নগদ ডলার ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। অর্থাৎ এটি পুরোপুরি বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার সিদ্ধান্ত নয়; বরং বৈধ ভ্রমণকারীদের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সীমা বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার একটি পদক্ষেপ। ১২ হাজার ডলারের পরিবর্তে ১৮ হাজার ডলারের সীমা নির্ধারণের ফলে বিদেশে শিক্ষা, চিকিৎসা, পর্যটন, পারিবারিক সফরসহ বৈধ ভ্রমণসংক্রান্ত ব্যয় মেটাতে গ্রাহকদের ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে তুলনামূলক স্বস্তি তৈরি হয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও আগের তুলনায় বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ভ্রমণ বাবদ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সীমা বাড়ানোকে বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির একটি ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা যেতে পারে। তবে এ সিদ্ধান্তের ফলে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়বে কি না এবং তা বাজারে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, সেটি নির্ভর করবে বিদেশ ভ্রমণকারীর সংখ্যা ও প্রকৃত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের ওপর।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, সিদ্ধান্তটির ইতিবাচক দিক হলো বৈদেশিক ভ্রমণের প্রকৃত খরচের সঙ্গে বিদ্যমান সীমার একটি অসামঞ্জস্য দূর করা। আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিমানভাড়া, আবাসন, চিকিৎসা, শিক্ষা, ভিসা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় আগের তুলনায় বেড়েছে। ফলে ১২ হাজার ডলারের সীমা অনেক ভ্রমণকারীর প্রকৃত প্রয়োজনের তুলনায় কম হয়ে থাকতে পারে। নতুন সীমা বাড়ানোর ফলে বৈধ ভ্রমণকারীরা অনানুষ্ঠানিক বা অননুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রা বাজারের পরিবর্তে ব্যাংকিং চ্যানেলের ওপর বেশি নির্ভর করতে পারেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তের লক্ষ্যও প্রকৃত ভ্রমণসংক্রান্ত বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা সহজ করা।

তবে বিশ্লেষণের আরেকটি দিক হলো, ভ্রমণসীমা ৫০ শতাংশ বাড়ানোর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বিদেশ ভ্রমণ বেড়ে গেলে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে ডলারের চাহিদা বাড়বে। ফলে সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রকৃত ভ্রমণকারীদের বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ এবং বাজারে ডলারের সামগ্রিক ভারসাম্যের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এ কারণে নগদ ডলারের সর্বোচ্চ সীমা ৫ হাজার ডলারে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে—এটি বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অতিরিক্ত নগদ ডলারের চাপ নিয়ন্ত্রণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সিদ্ধান্ত বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকে আরও আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে নিয়ে আসতে পারে। ভ্রমণকারীদের বৈধ প্রয়োজন মেটাতে ব্যাংকের মাধ্যমে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হলে কার্ব মার্কেটের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক কার্ড বা অন্যান্য অনুমোদিত মাধ্যমে বৈদেশিক ব্যয়ের সুযোগ বাড়লে নগদ ডলারের ওপর চাপও তুলনামূলকভাবে কম থাকতে পারে।

তবে এই সুবিধা যাতে অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি না করে, সে বিষয়েও নজরদারি প্রয়োজন। ভ্রমণসীমা বাড়লেও বাংলাদেশ ব্যাংক অন্যান্য বিদ্যমান নির্দেশনা অপরিবর্তিত রেখেছে। ফলে অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোর জন্য গ্রাহকের প্রকৃত ভ্রমণ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের উদ্দেশ্য এবং প্রযোজ্য বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সিদ্ধান্তকে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় একটি নিয়ন্ত্রিত উদারীকরণ হিসেবে দেখা যায়। একদিকে প্রকৃত ভ্রমণকারীদের জন্য বার্ষিক বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ ৫০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, অন্যদিকে নগদ ডলার নেওয়ার সীমা ৫ হাজার ডলারে অপরিবর্তিত রেখে অতিরিক্ত নগদ চাহিদার ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভ্রমণসংক্রান্ত বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদাকে অস্বীকার না করে সেটিকে আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্যে রাখার পথ বেছে নিয়েছে।

নীতিগতভাবে এটি বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে স্বাভাবিকতা ফেরার একটি ইতিবাচক সংকেত। তবে এর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে ব্যাংকিং চ্যানেলে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ, ভ্রমণকারীদের প্রকৃত চাহিদা এবং অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোর যথাযথ নজরদারির ওপর। নতুন সীমা তাই শুধু বিদেশ ভ্রমণকারীদের জন্য বাড়তি সুবিধা নয়; বরং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে নীতিকে সামঞ্জস্য করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

Please follow and like us:

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top