নিজস্ব প্রতিবেদক
আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবার ‘এএফআই মায়া ডিক্লারেশন কমিটমেন্ট অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ এবং ‘এএফআই জেন্ডার ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স চ্যাম্পিয়ন ইনস্টিটিউশন’—এই দুটি মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
গত ৩ সেপ্টেম্বর পাপুয়া নিউগিনির পোর্ট মোরসবিতে অনুষ্ঠিত অ্যালায়েন্স ফর ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশনের (এএফআই) বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণী ফোরামে বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে এ দুটি স্বীকৃতি তুলে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে পুরস্কার দুটি গ্রহণ করেন ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান। এএফআইয়ের বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণী ফোরামে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, ডেপুটি গভর্নর, নীতিনির্ধারক ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বিশেষজ্ঞসহ সাত শতাধিক প্রতিনিধি অংশ নেন।
মায়া ডিক্লারেশন কমিটমেন্ট অ্যাওয়ার্ড মূলত আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ, সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিতভাবে তুলে ধরা এবং বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা ও ফলাফল প্রকাশের স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক মায়া ডিক্লারেশনের আওতায় আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্য নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নে কাজ করে আসছে। ২০২৬ সালের পুরস্কারটি সেই অগ্রগতিরই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট এবং ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ মায়া ডিক্লারেশনের আওতায় নির্ধারিত বার্ষিক লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করছে। আর্থিক সেবার পরিধি বাড়ানো, সাধারণ মানুষের ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে আরও কার্যকর করার বিভিন্ন উদ্যোগ এ কার্যক্রমের অংশ।
এর আগে ২০২৫ সালেও মায়া ডিক্লারেশন কমিটমেন্ট অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই বছর বাংলাদেশ ব্যাংক বিদ্যমান লক্ষ্যগুলোর বিপরীতে সর্বাধিক অগ্রগতি প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। মায়া ডিক্লারেশনের আওতায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জাতীয় কিউআর ব্যবস্থা বিস্তৃত করা, আর্থিক শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি পরিমাপের মতো উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ‘এএফআই জেন্ডার ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স চ্যাম্পিয়ন ইনস্টিটিউশন’ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে নারীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকার ও উদ্ভাবনী উদ্যোগের জন্য। এ স্বীকৃতি আর্থিক সেবায় নারীদের প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় নারীদের অংশগ্রহণ আরও জোরদার করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এএফআইয়ের ডেনারাউ অ্যাকশন প্ল্যানের লক্ষ্যগুলোর সঙ্গেও বাংলাদেশ ব্যাংকের নারী-কেন্দ্রিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে নারীদের জন্য আর্থিক সেবায় প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো, আর্থিক ব্যবস্থায় তাদের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করা এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণের মতো বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অগ্রযাত্রায় এ দুটি স্বীকৃতি তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ এএফআই বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় ও আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক। বর্তমানে ৮২ দেশের ৮৯টি প্রতিষ্ঠান এএফআইয়ের সদস্য। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০০৯ সালের জুন থেকে এ নেটওয়ার্কের সদস্য হিসেবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিভিন্ন বৈশ্বিক উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে আসছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মায়া ডিক্লারেশনের আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ পর্যন্ত ১০৬টি অঙ্গীকার করেছে, যার মধ্যে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ৬০টি বাস্তবায়িত হয়েছে। চলতি ধারাবাহিকতায় নতুন অঙ্গীকার গ্রহণ ও পুরোনো অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনার মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
পরপর দুই বছর মায়া ডিক্লারেশন কমিটমেন্ট অ্যাওয়ার্ড অর্জন এবং একই সঙ্গে নারীবান্ধব আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে চ্যাম্পিয়ন প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি পাওয়া বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নীতির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকে আরও শক্তিশালী করেছে।


