জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও জনরায় সমুন্নত রাখার আহ্বান
নিজস্ব প্রতিবেদক:
গণভোটে প্রকাশিত জনরায় মেনে না নিলে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং পরবর্তীতে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত যেকোনো সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সেমিনারে অংশ নেওয়া বক্তারা। তাঁরা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং গণভোটে প্রকাশিত জনগণের রায় সমুন্নত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম হলে ‘গণভোট এবং জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা: হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণের আলোকে গণভোটের নৈতিক ও সাংবিধানিক ভিত্তি’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরাম এ সেমিনারের আয়োজন করে।
সেমিনারে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া প্রচলিত সাংবিধানিক কাঠামো অনুসরণ করেনি। তাঁর মতে, আগের সরকারের পতন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন এবং ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন—পুরো প্রক্রিয়াটিই প্রচলিত সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে সংঘটিত হয়েছে।
তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি, একক রাজনৈতিক দল বা প্রশাসনের ইচ্ছার ফল নয়। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা না হলে সরকারের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
বিএনপির সমালোচনা করে শিশির মনির বলেন, দলটি জুলাই অভ্যুত্থানকে বিপ্লব হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অনিচ্ছুক, কারণ এর কোনো একক রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছিল না। বিএনপি নিজেদের জনগণের দল হিসেবে দাবি করলেও গণভোট মেনে নিচ্ছে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। কয়েকজন ব্যক্তির স্বার্থ ও অহংবোধ জাতির ইচ্ছার ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সরকারকে এখন রাষ্ট্রনায়কসুলভ ভূমিকা নেওয়া নাকি দলীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রধান কৌঁসুলি তাজুল ইসলাম বলেন, বিএনপি বিভিন্ন সময়ে জুলাই সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করলেও বর্তমানে সেই অবস্থান থেকে সরে যাচ্ছে। তাঁর দাবি, বিরোধী দল সংসদের মাধ্যমে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার তানিম হোসেন শাওন বলেন, সংবিধানের বিভিন্ন দুর্বলতা ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। তাঁর মতে, আগের সরকার সাংবিধানিক বিধান ব্যবহার করেই কর্তৃত্ববাদী শাসন বজায় রেখেছিল। অন্যদিকে জুলাই অভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন এবং পরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়াও বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে সংঘটিত হয়েছে।
দৈনিক ওয়াদার সম্পাদক ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, একটি অংশ জুলাই অভ্যুত্থান এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ঘিরে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, এ ধরনের প্রচেষ্টা আওয়ামী লীগের প্রচারিত বয়ানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে তরুণ ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে যে রাজনৈতিক সচেতনতা ও আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা দমন করা সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এবি পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, ১৯৭৫ ও ১৯৯০ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম বড় সুবিধাভোগী ছিল বিএনপি। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে দলটি জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এবারও গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম বড় সুবিধাভোগী হওয়া সত্ত্বেও দলটি একই পথে এগোচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে বিএনপির সামনে গতিপথ পরিবর্তনের আরেকটি সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
গণবিপ্লবী উদ্যোগের প্রতিনিধি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আরিফ সোহেল বলেন, পুরোনো ব্যবস্থার তৈরি নিয়ম অনুসরণ করে রাজনৈতিক মুক্তি অর্জন সম্ভব নয়। ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার যুক্তির বাইরে গিয়ে জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অল্টারনেটিভের সংগঠক তাজনূভা জাবীন জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অহংবোধের কারণে জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হচ্ছে না। গণভোট বাংলাদেশের জনগণের রায় এবং সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকলে এ রায় বাস্তবায়ন কেউ বাধাগ্রস্ত করতে পারত না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী, জেডিপির আহ্বায়ক নাঈম আহমেদ এবং ভয়েস ফর রিফর্মের সৈয়দ হাসিব উদ্দিন হোসাইন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. দিলারা চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের যে মতামত বা জনরায় প্রকাশিত হয়েছে, তা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যথাযথভাবে প্রতিফলিত করা জরুরি। একই সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল ও গ্রহণযোগ্য করার ওপর তাঁরা গুরুত্বারোপ করেন।
